শিরোনাম :

প্রচ্ছদ » মুক্তমন

অন্ধকারের কব্জা : আনন্দবাজার সম্পাদকীয়

শনি, ২৬ ডিসেম্বর'২০১৫, ১১:৫৪ পূর্বাহ্ন


অন্ধকারের কব্জা : আনন্দবাজার সম্পাদকীয়  
জোর যাহার মুলুক তাহার। ইহাই রাজ-নীতি, অর্থাৎ শাসকের নীতি— পশ্চিমবঙ্গে। যিনি বা যাঁহারা এ রাজ্যে শাসক হন, তাহারা পুরাদস্তুর এই নীতি অনুসরণ করেন, এবং মুলুক বলিতে জমি-জমা-মন্ত্রী-সান্ত্রি সকল কিছুর উপর অধিকারই বুঝিয়া থাকেন। রাজ্যের সবই তাহার বা তাহাদের, তাহাদের কৃপা ব্যতীত অন্যথা হইতে পারে না। ইহার মধ্যে অকস্মাৎ গণতন্ত্র, ব্যক্তি-অধিকার ইত্যাদি কিছু জটিল ধারণার অবতারণা হইলে গোলযোগ উপস্থিত হইবেই। ঠিক তাহাই হইতেছে নাকতলায়। প্রশাসনের সর্বময়তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলিয়াছে বিচারব্যবস্থা। সরকার-অধিকৃত যে জমিটি সরকারি দাক্ষিণ্যে ক্লাব-ভোগ্য জমিতে পরিণত হইয়াছে, তাহা খালি করিতে নির্দেশ দিয়াছে। নির্দেশের পর দুই মাস কাটিয়াছে, কোনও হেলদোল হয় নাই। বরং ভারতের কলিকাতা পুরসভার শীর্ষকর্তা, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রবল পরাক্রান্ত নেতা শোভন চট্টোপাধ্যায় জানাইয়া দিয়াছেন, জমিটি রাখিতে সব রকম পদক্ষেপের কথা তাহারা ভাবিবেন। এত সোজাসুজি আদালতের নির্দেশ অমান্য করিবার দৃষ্টান্ত বিস্ময়কর হইতে পারে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে দুর্লভ বলা চলিবে না। হাইকোর্টের বিচারপতিও আদালতের তরফে বলিয়া দিয়াছেন, দরকারে সেনাবাহিনী নামানো হইবে। শাসনবিভাগ ও বিচারবিভাগের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে বটে, কিন্তু এমন সরাসরি দ্বৈরথ কমই দেখা যায়। পুলিশ নয়, নাগরিক সমাজ নয়, রাজ্যের বর্তমান শাসনবিভাগের নির্লজ্জ স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধতার জন্য আপাতত একটিই রাষ্ট্রীয় রক্ষাকবচ: বিচারবিভাগ। নাকতলার ঘটনায় লক্ষণীয়, কী ভাবে গণতন্ত্রের দুইটি বিভাগ পরস্পরকে শিক্ষা দিতে উঠিয়া-পড়িয়া লাগিয়াছে। এই দ্বৈরথের মধ্যে সর্বাপেক্ষা ন্যক্কারজনক ভূমিকাটি— পুলিশবাহিনীর। যে ভাবে তাহারা জমির বেআইনি ব্যবহারকারীদের রক্ষা করিতে ব্যস্ত, চোখের সামনে রাজনৈতিক গুন্ডাদের দাপুটে নৃত্য দেখিয়াও স্বয়ং পুলিশকর্তার মুখে কুলুপ, তাহা দেখিয়া আদালতেরও বিস্ময়ের সীমা নাই! বাস্তবিক, প্রয়োজন হইলে সেনাবাহিনী আসিবে, এত বড় কথাটি বলিতে হইয়াছে পুলিশবাহিনীর এই অসামান্য কদর্য ভূমিকা দেখিয়াই। সর্বোচ্চ পুলিশকর্তাও এ রাজ্যে অমলিনবদনে মুখ্যমন্ত্রীর তাম্বুলকরঙ্কবাহী হইতে আগ্রহী, জমিদখলকারী দুর্ব্যবহারকারী ‘সরকারি’ দুর্বৃত্তদের শাসনে তাহার তীব্র অনীহা। প্রশাসনের কোনও অপকার্যের বিরুদ্ধেই কাহারও কিছু করিবার নাই। বিচারালয়েরও নয়। শেষ অবধি, বিচারের বাণীটিকে কাজে পরিণত করিবার দায় তো প্রশাসনেরই। ক্ষমতার এই সর্বময়তা অবশ্যই নূতন নয়। বিগত বাম জমানাতেও এই পরিস্থিতিই ছিল, বস্তুত, নাকতলার জমির অপব্যবহার তো সেই আমলেই শুরু, তৃণমূল জমানা কেবল এই ক্ষমতাতন্ত্রের নির্লজ্জতাকে সুস্পষ্ট ও নিরাবরণ করিয়া দিয়াছে। চাপাচুপির ধার ধারে নাই। চাপাচুপির প্রয়োজন এমনিতেও নাই, কেননা তৃণমূল সরকার ইতিমধ্যে প্রমাণ করিয়াছে যে প্রকৃত গণতন্ত্রের বাস পাড়া-তন্ত্রেই। পুরসভার সহায়তায় পাড়ার ক্লাবগুলিকে তোষণ ও পোষণ করিলেই ভোটের ব্যবস্থা পাকা, আর ভোট ছাড়া গণতন্ত্রের আছেই বা কী! তাই ক্লাব চাহিলে জমি দান, ক্লাব না চাহিলেও টাকার থলি বিতরণ। জনতার কাছাকাছি থাকিবার মূলমন্ত্রটি পূর্বসূরি বামফ্রন্টের নিকট হইতে তৃণমূল কংগ্রেসের সার্থক উত্তরাধিকার, এবং ইতিমধ্যে গুরুমারা বিদ্যায় পরিণত। অন্য কোনও নীতির ধার না ধারিলেও এই রাজনীতির চলিয়া যায় ও যাইবে। আদালত যত বার আলোটি জ্বালিবার চেষ্টা করুক, তাহা নিবিবার সম্ভাবনাই বেশি। অন্ধকার রাজনীতির কব্জা পশ্চিমবঙ্গে চাপিয়া বসিয়াছে।



এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন

close