শিরোনাম :

প্রচ্ছদ » মুক্তমন

জরুরি অবস্থা আনার কৃতিত্বের দাবিদার মাহফুজ আনাম

শুক্র, ০৫ ফেব্রুয়ারী'২০১৬, ১০:৪৩ পূর্বাহ্ন


জরুরি অবস্থা আনার কৃতিত্বের দাবিদার মাহফুজ আনাম  
আমিরুল ইসলাম কাগজী
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের ভুল স্বীকার নিয়ে একটি খবর পড়লাম নিউজ পোর্টাল বিডিনিউজ ২৪ডটকম-এ।খবরটি নিজ কানে শুনিনি। এটিএন নিউজে মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় বুধবার রাতে এক আলোচনায় তিনি বলেছেন, “ডিজিএফআইয়ের দেওয়া ভিত্তিহীন খবর যাচাই না করে ছাপাটা সাংবাদিকতার ‘ভুল’।

তার এ সরল স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দী সম্পর্কিত খবর তাকে কতটুকু উপরে তুলেছে কিংবা কতটুকু নিচে নামিয়েছে সেটা বলতে পারব না।এ খবর পড়ার পর কেউ তাকে বাহবা দিতে পারেন আবার কেউ তাকে ঘৃণাও করতে পারেন।আমি এ দুটোর কোনোটাই করব না।তবে সেনাসমর্থিত জরুরি তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ক্ষমতায় বসানোর যে দম্ভোক্তি শুনেছি সে সম্পর্কে একটি মাত্র ঘটনার উল্লেখ করতে চাই।

অভিশপ্ত ১/১১ এর মাধ্যমে জেনারেল মঈন উ আহমদ এবং ফখরুদ্দিন আহমদরা ক্ষমতায় বসার মাত্র চারদিনের মাথায় অর্থাৎ ১৫ জানুয়ারি সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকদের এক বৈঠকে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। বৈঠকটি ডেকেছিলেন তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন।উদ্দেশ্য ছিল কিভাবে জরুরি অবস্থার মধ্যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায় তার একটা উপায় বের করা।দিনকাল কর্তৃপক্ষ ওই বৈঠকে যাওয়ার জন্য আমাকে পাঠিয়েছিল। আমি যথারীতি তথ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে উপস্থিত হয়ে দেখি সবাই আমার পূজনীয়।একমাত্র মরহুম মুসা ভাই ছাড়া ওই বৈঠকে উপস্থিত সবাই বেঁচে আছেন। দৃশ্যত মনে হয়েছিল মাহফুজ আনামের সঞ্চালনায় বৈঠকটি চলছিল।

তিনি যাকে বলতে বলছেন তিনি বক্তব্য দিচ্ছেন।অনেক বক্তা সেনা নিয়ন্ত্রিত ত্ত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষেই সাফাই গাইলেন।কেউ বললেন জরুরি অবস্থার মধ্যেও সংবাদপত্রে স্বাধীনতা বজায় রাখা যায় যার উদাহরণ পাকিস্তানের পারভেজ মুশাররফ।সেখানে নাকি সেনা শাসনও আছে আবার সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও আছে।এক সময় আমি দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোন পেলাম।সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে যেই মুহুর্তে বললাম সংবাদপত্রের স্বাধীনতা চাইলে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করতে হবে।অমনি হুংকার দিয়ে উঠলেন মাহফুজ আনাম ।বললেন, “হু আর ইউ টু স্পিক এগেনিস্ট দ্য ইর্মাজেন্সি? উই হ্যাভ ব্রট ইর্মাজেন্সি।”(জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলার আপনি কে? আমরাই জরুরি অবস্থা এনেছি)।কথাটা এখনো আমার কানে ধ্বনি-প্রতিধ্বনিত হয়ে ফেরে।তিনি কথাটা এমন ভাবে বললেন যে,জরুরি অবস্থা এনে তিনি খুবই পুলকিত এবং গর্বিত।আমার কানকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো-একজন সম্পাদকের মুখে এমন কথা শুনতে হলো দেখে।

মাহফুজ সাহেব আমাকে আর বক্তব্য দিতে দেবেন না-পারলে মাইক্রোফোন কেড়ে নেন।কিন্তু আমিও নাছোড়বান্দা। আমার বক্তব্য না দিয়ে মাইক ছাড়তে চাই না।তথ্য উপদেষ্টার হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমি বললাম ইমার্জেন্সি এনেছেন ভালো কথা-তাহলে আবার সংবাদপত্রের স্বাধীনতা চাইছেন কেন? এখানে উপস্থিত সব সাংবাদিক এরশাদের জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আসা।উনারা ভালো করেই জানেন জরুরি অবস্থায় সুপার এডিটর হন তথ্য মন্ত্রনালয়ের একজন যুগ্ম সচিব।তার ক্লিয়ারেন্স ছাড়া কোনো খবর পরিবেশন করা যায় না।এ প্রসঙ্গে তার ওইদিন ডেইলি স্টারে লেখা তারই মন্তব্য প্রতিবেদনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললাম, দীর্ঘ ১৬ বছর পর এই প্রথম তথ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো এক কর্মকর্তা আপনাকে টেলিফোনে জানিয়ে দিয়েছেন যে আমরা ইমার্জেন্সির মধ্যে আছি কথাটা মনে রাখবেন।আইএসপিআর বলে দিয়েছে সেনাবাহিনী সম্পর্কে কিছু লিখতে হলে তাদের অনুমতি লাগবে।এরপরও আপনার হুঁশ হচ্ছে না।এসময় তিনি বললেন,এজন্য আমরা জরুরি আইনের ৫এর (চ এবং ছ) ধারার শিথিল চাইছি।

এরপর তথ্য উপদেষ্টাকে উদ্দেশ্য করে বললাম আপনারা ক্ষমতায় এসেছেন ভালো কথা-এখন বলুন, কখন নির্বাচন দেবেন, কখন রাজনীতির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিবেন? এ কথা শুনে আবার তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন মাহফুজ আনাম।বললেন, নির্বাচনের কথা ভুলে যান, আর রাজনীতি? রাজনৈতিক দলদুটোর মধ্যে আগে সংস্কার আনতে হবে-তারপর রাজনীতির কথা মুখে আনবেন।এ সময় দূরে বসা তরুণ সম্পাদক এনায়েত হোসেন খান বলে উঠলেন “হুয়াই আর উই শাউটিং”, তাকে বলতে দেন।

সেদিনের আলোচনা আর বেশি দুর এগুতে পারেনি তবে সংবাদপত্রের জন্য জরুরি অবস্থা শিথিলের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত দেন নি উপদেষ্টা।

বৈঠক শেষ করে আমরা সবাই যখন তথ্যমন্ত্রণালয় ত্যাগ করছি তখন দেখি লিফ্টের সামনে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সব ক্যামেরা জেঁকে ধরেছে মাহফুজ আনামকে।মনে হলো এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তিনি।পাশ দিয়ে হেটে যাওয়ার সময় মূসা ভাই বললেন, কাগজী তো ঠিকই বলেছে-জরুরি অবস্থা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এক সঙ্গে চলতে পারে না।পরের দিন অনেক সংবাদপত্র আমাকে উদ্ধৃত করে খবরও প্রকাশ করেছিল।এতে আমার লাভের মধ্যে লাভ হয়েছিল যে, মাঝে মধ্যে ডিজিএফআইতে হাজিরা দিতে হয়েছে।

এরপর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে মাহফুজ আনামের ডেইলি স্টারের ভূমিকা দেশের রাজনৈতিক মহলে বহুল আলোচিত বিষয়।

আমিরুল ইসলাম কাগজী: সিনিয়র সাংবাদিক




এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন

close