শিরোনাম :

প্রচ্ছদ » মুক্তমন

স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে পাক নাগরিক স্বরই ভরসা

শুক্র, ১৯ ফেব্রুয়ারী'২০১৬, ৪:০৭ অপরাহ্ন


স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে পাক নাগরিক স্বরই ভরসা  
স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে পাক নাগরিক স্বরই ভরসা

নীলাঞ্জন হাজরা
আগর শায়রি মুহব্বতকি কিফায়ত করতিতো ম্যায় সমন্দরকে দোনো কিনারোঁকো শায়রিসে জোড় দেতা (কবিতা যদি সাশ্রয় করত ভালোবাসাতবে সমুদ্রের দুই পাড় আমি জুড়ে দিতাম কবিতা দিয়েই )-- আফজাল আহমেদ সৈয়দ (আমি পাইনি এত অঢেল জীবন ) ২০১০৷

ব্যবস্থা করা গিয়েছিল যাতে বর্তমানে পাকিস্তানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি আফজাল আহমেদ সৈয়দ এমনই কিছু পঙক্তি পড়ে শোনাতে পারেন তারই কবিতার বাংলা অনুবাদের সংকলন প্রকাশের একটি অনুষ্ঠানে৷ কলকাতা বইমেলায়৷ বন্দোবস্ত যখন বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়েছে , আহত ই-মেল পেলাম কবির কাছ থেকে - ভারতীয় হাইকমিশন আমায় ভিসা দিতে অস্বীকার করেছে৷ মন ভেঙে গেল৷ অধ্যাপক মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রবোধ দিলেন - কুছ পরোয়া নহি৷ আফজালকে ছাড়াই আমরা অনুষ্ঠান করব৷ সশরীরে নাই হোক , কবিতা বেয়েই করাচির স্বর এসে পৌঁছবে কলকাতায়৷ অনুষ্ঠানের যখন আর কয়েক দিন বাকি , আনন্দে আত্মহারা কবির আর এক ই-মেল - আজ হঠাৎ ভারতীয় হাইকমিশন থেকে ফোন করে ভিসা দেওয়ার জন্য আমার পাসপোর্ট চেয়ে পাঠানো হয়েছে৷ অনুপম খের সাহেবের ভিসা বিতর্ক কাগজে পড়ে আমার এই ঘটনাটাই মনে পড়ল৷ পাকিস্তান হাইকমিশন ঠিক একই কাণ্ড করেছে তার সঙ্গে৷ পার্থক্য এখানেই যে , আফজাল কলকাতা এসেছিলেন৷ অনুপম গোঁসা দেখিয়ে করাচি সাহিত্য সম্মেলনে গেলেন না৷ অবশ্য এও ঠিক যে আফজাল কবি মাত্র , বলিউডের তারকা নন৷


কিন্ত্ত এ নিয়ে অনুপমের নানা মন্তব্য পড়ে আমার মনে হয়েছে ভারতের অ -সরকারি স্বর পাকিস্তানের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার থেকে এই সুযোগে পাকিস্তানকে শরবিদ্ধ করায় তিনি বেশি উদগ্রীব৷ এই বিতর্কে যেটা ধামাচাপা পড়ে গেল তা হলো , একজনের ভিসা নিয়ে খানিকটা জলঘোলা হলেও করাচির ওই অনুষ্ঠানে দিব্যি ভিসা পেয়ে হাজির ছিলেন সালমান খুরশিদ বা নন্দিতা দাশের মতো বিশিষ্ট আরও সতেরো জন৷ মুশকিল হলো 'ভালো' খবরে 'খবর' হয় না৷ কাজেই করাচিতে গিয়ে তারা কী বললেন , কী করলেন , কী প্রশ্ন হলো , কী উত্তর দিলেন তা জানাই গেল না৷ না যাক৷

এই যে সতেরো জন আমন্ত্রিত হলেন এবং গেলেন এটা আসলে অনুপমের গোঁসার থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ খবর৷ বিশেষ করে যখন সে ঘটনাটা ঘটল মুম্বাইতে গজল -গায়ক গুলাম আলিকে না গাইতে দেওয়ার পরে এবং সব থেকে বড় কথা পাঠানকোটে সন্ত্রাসবাদী হামলার পরেও৷

কিন্ত্ত এরই মধ্যে ঢুকে পড়েছে ২৬/১১-র ভয়ঙ্কর মুম্বাই হামলার অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী ডেভিড কোলম্যান হেডলির বয়ান৷ আমরা অনন্ততম বার ফের জানলাম ওই হামলায় লস্কর -এ -তোইবা বা জয়েশ -এ -মুহম্মদের মতো সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের পাশাপাশি পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই এবং সে দেশের অনেক সেনাকর্তাও জড়িত৷ হেডলির বয়ান ভারত -পাকিস্তান সম্পর্ককে কতটা প্রভাবিত করবে ?

নিশ্চিত ভাবে বলা যায় আফগানিস্তান বা অন্য কোনো দেশে যাতায়াতের পথে পট করে প্লেন ঘুরিয়ে লাহোর বা অন্য কোনো শহরে নেমে পড়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের বাড়িতে চা -নাশতা করা অতঃপর কিছুকাল অসম্ভব হবে৷ কঠিন হবে সুষমা স্বরাজের সাম্প্রতিক পাকিস্তান সফরের মতো অদূর ভবিষ্যতে দু'দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পরস্পরের দেশে যাতায়াত৷ সুষমা ওই সফরের পর সংসদে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে 'পূর্ণাঙ্গ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা '-র মাধ্যমে 'সমগ্র অঞ্চলে শান্তি ও উন্নয়নের নতুন অধ্যায় শুরুর ' যে আশা প্রকাশ করেছিলেন সে গুড়ে গুচ্ছের বালি পড়বে৷ পড়বেই৷পড়বে এই কারণেই যে ভারতীয় আদালতে হেডলির বয়ানকে 'প্রমাণ ' হিসেবে হাজির করে মুম্বই হামলায় জড়িত সকলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারত পাকিস্তানের উপর যে চাপ সৃষ্টি করবে , পাকিস্তান তার উত্তরে বড়ো জোর কিছু প্রসাধনিক পদক্ষেপ করা ছাড়া আর কিছুই করবে না৷ করতে পারে না৷ করতে পারে না এই কারণেই যে তা করতে হলে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির ভিত যতটা পাকাপোক্ত হওয়া দরকার আসলে তা একেবারেই নয়৷ পাকিস্তানের সংসদ 'মজলিস -এ -শুরা '-র সেই গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা নেই৷ আরও বিপজ্জনক - সেই গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা নেই পাকিস্তানের বিচার প্রক্রিয়ারও৷

পাকিস্তানের সেনার ছায়া দীর্ঘ এবং গভীর৷ সেই কারণেই পাকিস্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইংরেজি সংবাদপত্র ডন 'A Sad Day' শিরোনামের সম্পাদকীয়তে ২০১৫ -র ৩ জানুয়ারি মন্তব্য করে , 'In the end, our political leadership proved unable to defend the constitutional and democratic roots of the system or resist the generals' demands'৷

সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলায় নওয়াজ শরিফ সরকার দেশে ফের সামরিক আদলত ফিরিয়ে আনার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তারই দ্ব্যর্থহীন বিরোধিতা করে 'ডন'-এর এই সম্পাদকীয়৷ 'দেশে সেনাশাসন জারি হওয়া উচিত' - রাজনীতিকদের চূড়ান্ত দুর্নীতি ও অপদার্থতায় বিরক্ত হয়ে ঘরোয়া আড্ডায় এমন আলটপকা মন্তব্য আমরা সকলেই কখনও না কখনও শুনেছি৷ পাকিস্তানে সেটা হতাশ নাগরিকের আলটপকা মন্তব্য মাত্র নয়, কঠোর বাস্তব৷ সেনাবাহিনী মাত্রই যুদ্ধবাজ৷ বিশ্বের কোনো দেশেই এর কোনো ব্যতিক্রম নেই৷ আসলে সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক বিশ্বব্যবস্থায় সর্বত্রই সেনাবাহিনীকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয় এই যুদ্ধবাজি তার মূলগত যুক্তির মধ্যেই নিহিত৷ একে 'ভালো' বা 'মন্দ' বলে প্রশংসা করা বা গাল পাড়া অর্থহীন৷ পাকিস্তান ও ভারতের যে ভূরাজনৈতিক বাস্তব, সে বাস্তব ইতিহাসের নানা মার-প্যাঁচ থেকে সৃষ্টি হয়েছে৷ আর সে বাস্তবে সেনাবাহিনীর এই যুদ্ধবাজি আরও অবশ্যম্ভাবী৷ সে বাস্তবকে কবিতার সাশ্রয় করা ভালোবাসা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না৷ কেবল গণতন্ত্রের লাগাম পরিয়ে সে বাস্তবের রাশ টানা যেতে পারে৷ সেটা ভারত পারে৷পাকিস্তান পারে না৷ এখনও পারে না৷ নওয়াজ শরিফ সরকার যদি এখনই তাল ঠুকে হেডলির বয়ান মিলিয়ে মিলিয়ে পাকিস্তানি সেনা, গুপ্তচর এবং তাদের ভারত-বিরোধী পরিকল্পনার জরুরি বোড়েগুলির মাথা কাটতে শুরু করে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে গোটা ব্যবস্থাটাই৷ পাকিস্তানের রাস্তায় রাস্তায় ফের সাঁজোয়া গাড়ি টহলো দেবে৷

আমাদের পছন্দ হোক বা না হোক, এইটাই পাকিস্তানের বাস্তব৷ সে ক্ষেত্রে কেবল তম্বি করা ছাড়া ভারত আর কিস্যু করতে পারবে না৷ মনে রাখুন, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী লাক্ষাদ্বীপ বা ভুটানের সেনা নয়, ভারতের মতোই পুরোদস্তুর পারমাণবিক অস্ত্রে সুসজ্জিত সেনা৷ কাজেই দু' দেশের সামরিক পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে 'ম্যাড' - mutually assured destruction! তা ছাড়া পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রয়োজনে যে সেনাকর্তাদের কখনও ততটা গোপন নয় , কখনও গোপন সাহায্য নিয়েই থাকে এটাও পাকিস্তানের দীর্ঘকালীন বাস্তব৷ তা হলে? মুম্বাই, পাঠানকোট হতেই থাকবে আর আমরা উদ্বাহু হয়ে 'শান্তি শান্তি ' বলে নেত্য করতেই থাকব? না৷ তম্বি করব৷ করতেই হবে৷ দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় করতে হবে৷ আন্তর্জাতিক মঞ্চে করতে হবে৷ কিন্ত্ত আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ আফজাল বা অনুপম এর পরেও ভিসা পাচ্ছেন কি না তার উপর নজর রাখা৷ সাধারণ নাগরিকদের দু'দেশের মধ্যে যাতায়াত কতটা সচল থাকছে তার উপর নজর রাখা৷ আমি বিশ্বাস করি গণতন্ত্র সংক্রামক৷ এই সংক্রমণের জ্বরে অনেক ভয়ঙ্কর স্বৈরতান্ত্রিক, অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পতন আমরা ইতিহাসে দেখেছি৷ বছর দুয়েক আগে পাকিস্তানে গিয়ে দেখে এসেছি সেই জ্বর সেখানে ছড়াতে শুরু করেছে৷ আর তাতে অকুতোভয় ভূমিকা নিয়েছেন সে দেশের সাংবাদিকরা৷

সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিয়ে সোচ্চার কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে ) জানাচ্ছে ১৯৯২ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত খুন হয়েছেন ৫৭ জন পাকিস্তানি সাংবাদিক৷ (এখানে বলতেই হবে ভারতের অবস্থাও খুব গর্ব করার মতো কিছু নয়৷ এ দেশে সে সংখ্যাটা ৩৭৷ ) কিন্ত্ত যেমনটা আমরা দেখেছি ডন পত্রিকার উপরে উদ্ধৃত মন্তব্যে, গণতন্ত্রের পক্ষে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমের একটি বড়ো অংশের স্বর দিনে দিনে তীব্রতর হচ্ছে৷ করাচি বা লাহোরে অনুষ্ঠানের মঞ্চেও পাকিস্তানি সাংবাদিকদের যে ভাবে অসামরিক ও সামরিক নেতৃত্বের দুর্নীতি আর অপদার্থতার বিরুদ্ধে সরব হতে দেখেছি তেমনটা এ দেশে সচরাচর দেখি না৷ এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি - ইন্টারনেট , ফেসবুক, হোয়াট্সঅ্যাপ ...৷ যা ভূরাজনৈতিক সীমান্ত মানে না৷ পাকিস্তান সরকার কিন্ত্ত এ পর্যন্ত তার উপর কোনো খবরদারি করেনি৷ একটা গণতান্ত্রিক কল চলতে শুরু করেছে৷ ২০১৩ সালে প্রথম বার পাঁচ বছরের পূর্ণ মেয়াদ পূরণ করেছে একটি নির্বাচনে জেতা অসামরিক সরকার৷ তারপর গণতান্ত্রিক নির্বাচনে হেরে পাকিস্তান পিপল্স পার্টি ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছে পাকিস্তান মুসলিম লিগের হাতে৷ এই প্রক্রিয়াটির কোনো শর্টকার্ট নেই৷ আমরা নাগরিকরা চাই বা না চাই ঘোষিত ও অঘোষিত যুদ্ধপ্রস্ত্ততি নিতেই থাকবে দু' দেশের সেনাবাহিনী৷

আবার, জনসমক্ষে যতোই তম্বিতম্বা চলুক, দু' দেশের রাজনীতিকরা এও বিলক্ষণ বোঝেন যে , দু' দেশের সম্পর্কের এসপার ওসপার ঠিক করে নেওয়ার ক্ষেত্রে পুরোদস্ত্তর যুদ্ধ আর কোনো বাস্তব সম্মত বিকল্প নয়৷ তা ছাড়া সন্ত্রাসবাদ যতই ভূরাজনৈতিক সীমানা ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক চেহারা নেবে ততই দু' দেশের সামরিক ও অসামরিক নেতৃত্বের মধ্যে এর মোকাবিলায় একটা বোঝাপড়া তৈরি হবেই , আজ বা কাল৷ সেই জন্যই মোদীর শপথগ্রহণে শরিফের হাজিরা আর শরিফের বাড়িতে মোদীর নাশতা৷ ইত্যবসরে ওই ভিসা দেওয়া নেওয়াটা যাতে সচল থাকে নাগরিকদের নজর রাখতে হবে তার উপর৷ বন্ধ হলে চেঁচামেচি জুড়তে হবে৷ আর অনেক প্ররোচনা - শুধু বাইরের প্ররোচনাই নয় , নিজের মগজ -মনের মধ্যের প্ররোচনাও উপেক্ষা করে তিলে তিলে সাশ্রয় করতে হবে ভালোবাসা , নতুবা শুধুমাত্র কবিতা দিয়ে দুই পাড় জুড়ে দেওয়া কবির পক্ষে সম্ভব হবে না৷

নীলাঞ্জন হাজরা: ভারতীয় গণমাধ্যমকর্মী




এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন

close