শিরোনাম :

প্রচ্ছদ » সাহিত্য

পালনীয় ওয়াহিদুল হক

শুক্র, ১১ মার্চ'২০১৬, ৭:৩৮ অপরাহ্ন


পালনীয় ওয়াহিদুল হক  
ওয়াহিদুল হক স্মারণিক মিলনোৎসব শুরু হয়েছে ১১ মার্চ থেকে। ওইদিন সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগারের শওকত ওসমান মিলনায়তনে প্রধান অতিথি হিসেবে দুই দিনব্যাপী উৎসবের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরী। ওয়াহিদুল হক স্মরণে একটি লেখা লিখেছেন রবিশঙ্কর মৈত্রী। লেখাটি প্রিয়.কমের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো। 
এক.

‘কাছে যবে ছিলে পাশে হল না যাওয়া,
চলে যবে গেল তারি লাগিল হাওয়া।’
মাঝে মাঝেই এখানে ওখানে দেখা হত নানান লক্ষ্য ও উপলক্ষে। কণ্ঠশীলনে প্রয়োগ পর্যায়ের পঠনকালে পাঠনের নিমিত্তে কতোবার কতো দিনই তিনি এসেছেন আমাদের কাছে। টিএসসির মাঠেও বসেছি রবীন্দ্র-লিপিকা নিয়ে। সম্বোধনে ভাই, স্যার বলার সম্পর্কটা ঘুচেছিল কদিনেই। অথচ তখন তিনি আটান্ন, আমি আমরা সবে কুড়ি পেরিয়েছি। একটু মনোযোগী না-হলে ওয়াহিদ ভাইয়ের কথা মরমে পৌঁছনো কঠিন হত। কথায় পড়ায় কখন সন্ধ্যা নামত বুঝতেই পারতাম না। পড়ানো শোনানো শেষ হলে আচমকা হনহন করে হেঁটে তাঁর পরের গন্তব্যে চলে যেতেন।
ওয়াহিদুল হক একটু যেন আচমকাই চলে গেছেন, দেহাবসানের ডাক কখন আসে কে জানে। যখন ছিলেন--মনে হত, আছেনই তো। কথা হবে, না-জানাগুলো সময় করে জেনে নেওয়া যাবে। সময় হয়নি। তাঁর হাওয়াটাই এখন আমাদের পরম পাওয়া হয়ে আছে।
তাঁকে দেখে কখনো মনেই হত না তিনি ব্যস্ত আছেন। ব্যস্ততার ভাবে ভারে কখনো তাঁর মুখে ক্লান্তি বিরক্তির ছাপ কেউ কোনোদিন দেখেছেন বলে মনে হয় না। কতো কর্মযজ্ঞে তিনি ছিলেন পুরোধা, পুরোহিত; কতো আয়োজনে ন্যস্ত থাকতেন—অথচ সতত অবিচল কর্তব্যবোধে আবদ্ধ পৃথিবী এক। তাঁর সময়গুলো মিনিট-মেপে বাঁধা ছিল—অথচ কাউকে কখনো বুঝতে দেননি—কোথাও তাঁকে এক্ষুনি যেতে হবে। নিজের তাড়াভাব দেখালে যে কাউকে বিব্রত কিংবা উপেক্ষা করা হয়—তাঁর কাছ থেকেই শেখা।
ওয়াহিদুল হক (১৯৩৩-২০০৭) আপনি আচরি আমাদেরকে কতো কিছু শিখিয়ে গেছেন। আমাদেরকে কেবল পাঠ আবৃত্তি গানে ব্রতী করাই লক্ষ্য ছিল না তাঁর। লক্ষ্য প্রথমত পরিশীলিত মানুষ করে তোলা। এই পরিশীলনের জন্য যা যা লাগে তার সকল আয়োজনের আয়োজক ছিলেন ওয়াহিদুল হক।
ওয়াহিদুল হক নামটির পাশে শত শত বিশেষণ যোগ করে; প্রতি বছর তাঁকে সাড়ম্বরে স্মরণ করে কিছুই হয় না, যদি তাঁকে আমরা পালন না করি। উৎসবে অনুষ্ঠানে তাঁর জীবন কর্মের কথা নানাভাবে বলে গেয়ে পাঠ করে, তাঁকে কেবল স্তব করে কিছুই হবে না; যদি না তাঁকে আমরা অনুসরণ করি।
ওয়াহিদুল হক কী বলতেন, কী গাইতেন, কী চাইতেন? তাঁর চাওয়াগুলো আমরা চিনেছি; মনেও নিয়েছি; কিন্তু এখনো মানা হয়নি। তাঁর সেই চাওয়াগুলো পাওয়া হলেই আমরা পাব শুদ্ধ মানুষ সুন্দর সমাজ তথা সুস্থ রাষ্ট্র।
দুই.

বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল—
পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।।
 
একদিন আমরা কণ্ঠশীলনের ক্লাসে সহজ পাঠ থেকে পড়ছিলাম। রবীন্দ্রনাথের সহজ পাঠ, প্রথম ভাগ। পড়াচ্ছিলেন ওয়াহিদুল হক। আমার পালা এল—আমি পড়লাম :
বাদল করেছে মেঘের রং ঘন নীল। ঢং ঢং করে ৯টা বাজল। বংশু ছাতা মাথায় কোথায় যাবে? ও যাবে সংসারবাবুর বাসায়। সেখানে কংসবধের অভিনয় হবে। আজ মহারাজ হংসরাজসিংহ আসবেন। কংসবধ অভিনয় তাঁকে দেখাবে। বাংলাদেশে তাঁর বাড়ি নয়। তিনি পাংশুপুরের রাজা। সংসারবাবু তাঁরি সংসারে কাজ করেন। কাংলা, তুই বুঝি সংসারবাবুর বাসায় চলেছিস? সেখানে কংসবধে সং সাজতে হবে। কাংলা, তোর ঝুড়িতে কী? ঝুড়িতে আছে পালং শাক, পিড়িং শাক, ট্যাংরা মাছ, চিংড়ি মাছ। সংসারবাবুর মা চেয়েছেন।
পড়ে নিজেই হেসে ফেললাম। ঠিক যেন শিশুদের মতো ধরে ফেলেছি—রবীন্দ্রনাথ অনুস্বরের পরিচয় দিচ্ছেন। বেশ মজা পেলাম। রং ঢংঢং বংশু সংসারবাবু কংসবধ হংসরাজ—ওয়াহিদুল হককে মনে হল যেন সাক্ষাৎ রবীন্দ্রনাথ। তিনি মাঝে মাঝে নিজেই নরম করে আরাম করে সহজ পাঠ থেকে পড়েও শোনাচ্ছিলেন।
একে একে পড়ে শোনাতে শোনাতে এক কথাবাজ তরুণের পালা এল। সে সহজপাঠ থেকে না পড়ে আকস্মিকভাবে বলে ফেলল—নজরুলের কিছু নাই? খালি রবীন্দ্রনাথ কেন? নজরুল কী দোষ করল?
আমরা কেমন বিব্রত কুণ্ঠিত হলাম। বলে কী? হঠাৎ এখানে নজরুলের প্রসঙ্গ কেন?
ওয়াহিদুল হক একটুও বিব্রত বিচলিত না-হয়ে বললেন, ‘‘নজরুল কোনো দোষ করেননি। দোষ করছ তুমি। নজরুলকে তুমি অপমান করছ। তুমি যেন আর দোষ না-করো সেই  জন্যই তোমাকে রবীন্দ্রনাথ পড়তে হবে।’’
তাঁর কথাগুলো সেদিন এরকমই ছিল।
মনে মনে বলি, এই যে নজরুলভক্ত তরুণ। তুমি কি জানো কাজী নজরুল ইসলাম কতোটা দুঃখ পেয়ে বলেছিলেন—
হিন্দু-মুসলমানে দিনরাত হানাহানি, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, মানুষের জীবনে একদিকে কঠোর দারিদ্র্য, ঋণ, অভাব অন্যদিকে লোভী অসুরের যক্ষের ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা পাষাণ-স্তূপের মতো জমা হয়ে আছে--এই অসাম্য, ভেদজ্ঞান দূর করতেই আমি এসেছিলাম। আমার কাব্যে, সঙ্গীতে, কর্মজীবনে, অভেদ-সুন্দর সাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম। আমি যশ চাই না, খ্যাতি চাই না, প্রতিষ্ঠা চাই না, নেতৃত্ব চাই না। জীবন আমার যতো দুঃখময়ই হোক, আনন্দের গান, বেদনার গান গেয়ে যাব আমি। দিয়ে যাব নিজেকে নিঃশেষ করে সকলের মাঝে বিলিয়ে। সকলের বাঁচার মাঝে থাকব আমি বেঁচে। এই আমার ব্রত, এই আমার সাধনা, এই আমার তপস্যা।
তিন.

দুষ্টু শিশুরা দুর্বল টিকটিকির লেজ কেটে দিয়ে আনন্দ পায়। মূল শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে টিকটিকির লেজ অসহায়ভাবে কিছুক্ষণ লাফানোর পর স্থির হয়ে যায়। আমাদের এই সমাজ রাষ্ট্রের শরীরেও অঙ্গাঙ্গীভাবে কিছু চেতনাবাহী মানুষ আছে; কিন্তু তারা দুর্বল। সেই চেতনাবাহী মানুষগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার জন্য দুষ্টু লোকের অভাব নেই। তারা সুযোগ বুঝে সুস্থ সমাজের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কর্তন করে দূরে দাঁড়িয়ে হাসতে থাকে, বিকৃত আনন্দ উপভোগ করতে থাকে।
বিভেদ তৈরি না-হলে প্রতিপক্ষ দাঁড়ায় না। প্রতিপক্ষ না দাঁড়ালেই মানুষ সাম্যবাদী হয়ে উঠতে পারে। সাম্যবাদী সমাজে সুবিধাবাদীর স্থান নেই। তাই সুবিধাবাদীরা সবখানে বিভেদ তৈরি করতে চায়। বিভেদ তৈরির সবচেয়ে বড়ো অস্ত্র সাম্প্রদায়িকতা। ওয়াহিদুল হক এই সাম্প্রদায়িকতার বিষই মানুষের মন থেকে নিঃশেষ করতে চেয়েছিলেন।
মানুষকে মানুষ হয়েওঠার প্রথম ধাপই অসাম্প্রদায়িকতা। সাম্প্রদায়িকতা মানে অন্য সম্প্রদায়কে প্রতিপক্ষ মনে করা। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিপক্ষের প্রতি সাম্প্রদায়িক মানুষের মন হিংসা বিদ্বেষে ভরে ওঠে। যে মানুষের মনের মধ্যে হিংসা আর বিদ্বেষ খেলা করে সে কখনোই সুস্থ সুন্দর মানুষ হতে পারে না।
আমাদেরকে অসাম্প্রদায়িক হতে হবে। অসাম্প্রদায়িক হতে হলে নিয়মিত কিছু পরিশীলন প্রয়োজন। আর সে-জন্যেই ওয়াহিদুল হক পঠন পাঠন শ্রবণকে গুরুত্ব দিয়েছেন। আর এই কাজগুলো কেবল একলাঘরে বসে করার নয়। তিনি চেয়েছেন সম্মিলন হোক। মানুষের মেলবন্ধন হোক। পরস্পরে হাতে হাত ধরে চেতনার কথা বলুক। হাতে হাতে ধরে নেচে নেচে আনন্দ উদযাপন করুক। সমস্বরে উচ্চারিত হোক—
পিছায়ে যে আছে তারে ডেকে নাও
নিয়ে যাও সাথে করে—
কেহ নাহি আসে, একা চলে যাও
মহত্ত্বের পথ ধরে।
পিছু হতে ডাকে মায়ার কাঁদন,
ছিঁড়ে চলে যাও মোহের বাঁধন—
সাধিতে হইবে প্রাণের সাধন,
মিছে নয়নের জল ভাই!
আগে চল, আগে চল ভাই। 




এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন

close