শিরোনাম :

প্রচ্ছদ » ইসলাম

এর নাম কি ‘জিহাদ’

রবি, ১৩ মার্চ'২০১৬, ১:৪৪ অপরাহ্ন


এর নাম কি ‘জিহাদ’  
ওয়াহিদুদ্দীন খান
তর্জমা : সালেহ ফুয়াদ
[মাওলানা ওয়াহিদুদ্দীন খান একজন ইসলামিক স্কলার এবং শান্তি আন্দোলনের সক্রিয় ব্যক্তিত্ব। এ পর্যন্ত তিনি তার কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ বেশ কিছু পুরস্কার অর্জন করেছেন। এর মধ্যে রয়েছ, ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পদ্মভূষণ ও রাজীব গান্ধী পুরস্কার। শান্তির জন্য পেয়েছেন সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ পুরস্কারসহ আরও বহু পুরস্কার।
ইসলাম তলোয়ারে নয়, উদারতায় এসেছে—যেন এর প্রমাণ দিতে অনবরত লিখে চলেছেন ওয়াহিদুদ্দীন খান। এখন তিনি অশিতিপর বৃদ্ধ, তবু অক্লান্ত পরিশ্রমী। তিনি তার কাজের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিসকোর্স হাজির করেছেন। বাংলাভাষীদের কাছে তিনি অতটা পরিচিত নন। তবে তার চিন্তাধারা ইসলামী স্কলারদের ছাড়াও এখানকার প্রগতিশীল লোকজনের সুকুমার ভাবনার খোরাক জোগাবে বলে বিশ্বাস করা যায়।
তাঁর তুমুল আলোচিত একটি বই ‘শাতমে রসুল কা মাসআলা’ । এটির তর্জমা ধারবাহিকভাবে ছাপা হচ্ছে দ্য রিপোর্টে। পড়ুন সম্মানিত পাঠক, আর এ বিষয়ে মতামত জানান দ্য রিপোর্টের পাতায়। বি.স.]
বেঙ্গালুরের ইংরেজি কাগজ ডেকান হেরাল্ড (৭ ডিসেম্বর ১৯৮৬) একটি গল্প ছাপে। গল্পটিতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অপমান করা হয়। এ নিয়ে স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দারা রেগে অগ্নিশর্মা হয়। তারা কাগজটির গুদাম জ্বালিয়ে দেয়। এতে এক লাখ রুপির মত কাগজ ছিল। পাকিস্তানের ইংরেজি কাগজ ফ্রন্টিয়ার পোস্ট-এ (৭ জানুয়ারি ১৯৮৭) একটি পশ্চিমা পত্রিকা থেকে নিয়ে একটা প্রবন্ধ ছাপে। লেখাটির সঙ্গে আদম হাওয়ার একটি ছবি ছিল। তাও ছেপে দেয়। হাজার দেড়েক আবেগি মুসলিম পত্রিকাটির বিশাল ইমারতটিকে ঘিরে ফেলে। এরপর আসবাবসমেত বিল্ডিংটি জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়।
যে দেশে মুসলমানদের স্বাধীনতা আছে সেখানে এ ধরনের ঘটনা ঘটেই চলছে। মুসলিমরা তাদের স্বাধীনতাকে এসব ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহার করছে। এসব কাজের নাম আবার ‘ইসলামি জিহাদ’ দিয়েছে।
সন্দেহ নাই, এ ধরনের প্রতিটা কাজই অনৈসলামি। এগুলো জিহাদ নয়। নেহায়েত মূর্খতা। নিকৃষ্ট অপরাধ। এ বিষয়ে শরিয়তের নির্দেশ জানতে আমরা একটি হাদিস দেখে নিতে পারি। আর সেটি এই—
عن ابي هريرة قال: ان رسول الله صلي الله عليه و سلم اتي برجل قد شرب الخمر فقال: "اضربوه" فمنا الضاربيده والضارب بثوبه والضارب بنعله . ثم قال: "بكستوه" فاقبلوا عليه يقولون: ما اتقيت الله وما استحييت من رسول الله صلي الله عليه و سلم. فقال بعض القوم: اخزاك الله. قال: لاتقولوا هكذا لاتعينوا عليه الشيطان و لكن قولوا: اللهم اغفرله اللهم ارحمه (رواه ابو داود)
অর্থ-হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা বলেন, মহানবির কাছে এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হল। লোকটি মদ পান করেছিল। মহানবি সা্ল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, একে মার। আমাদের মধ্যে কেউ হাতে, কেউ কাপড় দিয়ে, কেউবা জুতো দিয়ে মারতে লাগলেন। এরপর মহানবি সা্ল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, একে ভীতি প্রদর্শন কর। লোকজন বলতে লাগলেন, তোমার কি ভয় করে না, তোমার কি খোদার ভয় নাই, রসুলুল্লাহর কাছে লজ্জা হয় না। এরপর উপস্থিত কেউ কেউ বলে বসেন, আল্লাহ আপনাকে অপদস্থ করুন। এ কথা শুনে মহানবি সা্ল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এভাবে বলে শতানের সহযোগী হয়ো না। বরং বলো- হে খোদা একে মাফ করুন। রহম করুন। (আবু দাউদ)
এ হাদিসের মাধ্যমে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার। প্রথমত সাহাবিগণ লোকটিকে মদ্যপ দেখেই মারতে শুরু করেন নি। মদিনার বিচারক মুহাম্মদ সা্ল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে নিয়ে আসেন। এতে জানা গেল, কেউ যদি এমন কাজ করে যা শরিয়াহ মতে অপরাধ, তখনো জনসাধারণের এ অধিকার নেই যে, নিজেরা নির্ধারিত সে সাজা কার্যকর করেন। সাজা দেয়ার অধিকার শুধুই বিচারকের। এ ভার বিচারকদের উপর ছেড়ে দেয়া উচিত।
দ্বিতীয়ত, প্রমাণিত অপরাধীকেও সহৃদয় সাজা দেওয়া উচিত। শুধু শাস্তি দিবে। লাঞ্ছিত করবে না। কোন ধরনের মৌখিক বা শারীরিক অপমান নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করে। অপমান ও তাচ্ছিল্য ধর্ম ও ধার্মিকদের উপর ঘৃণার জন্ম দিবে। এতে ঘৃণা ও প্রতিশোধী মনোভাব দ্রোহের সৃষ্টি করবে। আগে সত্য থেকে এক কদম দূরে থাকলে পরে শত কদমের দূরত্ব তৈরি হবে। শয়তান বৈরী মনোভাব জাগিয়ে তাকে নিজের শিকার বানাবে।
এ ব্যাপারে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা যা আমাদের ভালো করে বোঝা উচিত। কোন অপরাধের শরয়ী সাজা তাই যা কুরআন-সুন্নাহয় নির্দেশিত। এর বাইরে কোন ধরনের শাস্তি দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম কাজ। যেমন, মদ্যপের শাস্তি হল তাকে মারা। তো মদপানের অপরাধে মধ্যপের ভাই-বোনকে মারপিট করা বা বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া অথবা তার কারখানা লুট করা কোন মতেই জায়েজ নয়।
সাজা কার্যকরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্তব্য হল, কোন অভিযোগ সামনে এলে তার সুষ্ঠু তদন্ত করা। তদন্ত ও সাক্ষ্যের মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণিত হলে শরিয়তের নির্ধারিত সাজা প্রদান করা। নির্ধারিত শাস্তির বাইরে কিছু করা শরিয়তের তামিল নয় বরং শরিয়তের সঙ্গে বিদ্রোহ। এমন ব্যক্তি নিজেই সবচেয়ে বড় অপরাধী। অন্যদের মনগড়া শাস্তি দেওয়ার অধিকার তার নাই।
জাহেলিয়াতের যুগে ইহুদি এবং আরবরা উঁচুবংশীয় ও নিচুবংশীয় অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির তারতম্য করত। এ নিয়ে কুরআনে কেসাসের আয়াত ( বাকারাহ, আয়াত : ১৭৮) অবতীর্ণ হয়। এতে কতলকৃত ব্যক্তিদের ব্যাপারে সাম্যতাকে ফরজ করা হয়েছে। কতলের সাজায় কেসাসের শরয়ী নির্দেশ অমান্য করা অথবা ক্ষমা এবং ক্ষতিপূরণ গ্রহণের পরও খুনিকে হত্যা করে ফেলাটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ের। এ ধরনের বাড়াবাড়ির ফল আল্লাহর তরফে ভয়ানক শাস্তি ।
হাদিসে বলা হয়েছে, কতলকৃত ব্যক্তির জন্য তিনটে পথ। কেসাস, ক্ষমা অথবা ক্ষতিপূরণ। চার নম্বর কিছু চাইলে গ্রেফতার। এরপরও যে বাড়াবাড়ি করবে তার জন্য আছে দোজখের আগুন। চিরস্থায়ী আগুন। (তাফসিরে ইবনে কাসীর, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১০)
শরিয়াহর এ নির্দেশমতে, অপরাধ ও শাস্তির সমতারক্ষা করা জরুরি। কোন অপরাধীকে শরিয়তের নির্দিষ্ট শাস্তি দেওয়া অথবা নির্ধারিত শাস্তি ছাড়া অন্য কোন শাস্তি দেওয়া সাফ হারাম। কারো দ্বারা শরয়ী অপরাধ ঘটলে সে অপরাধীর উপরই তা কার্যকর করতে হবে। এর বাইরে তার সম্প্রদায়ের অন্য কাউকে মারা অথবা অপরাধীর জিনিস-পত্তর জ্বালিয়ে দেওয়া স্পষ্ট হারাম কাজ। যে ব্যক্তি এমনটা করে অথবা এমন কাউকে সাহায্য করে এমনকি যে ব্যক্তি এ ধরনের কর্ম দেখেও চুপ থাকে তারা সবাই নিজেদেরকে বিপদে ফেলবে। আল্লাহ তাদের ভীষণ শাস্তি দিবেন।
রাষ্ট্রক্ষমতা যদি এমন লোকদের হাতে থাকে যারা- অপরাধীদেরকে শরিয়াহ অনুযায়ী শাস্তি দেবেন না, তখনো মুসলমানদের জন্য আইন হাতে তুলে নেওয়া জায়েজ নয়। এ অবস্থায় শাস্তি নয়, ধৈর্যধারণ মুসলমানের কাজ। মহানবির মক্কার জীবন এ শিক্ষাই দেয়। তখন মক্কার লোকেরা প্রকাশ্যে মদ পান করত। মহানবি সা; বা সাহাবিগণ তাদের উপর হদ (দণ্ডবিধি) আরোপের কোন কোশেশই করেন নি। হদ কার্যকর করেছেন ক্ষমতা লাভের পর।
অনূভূতির মূল্য নাই
এ ধরনের ঘটনায় সাধারণত বলা হয় যে, “মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে”। মুসলমানদের ভালোভাবে বুঝা উচিত যে, কোন সম্প্রদায়ের অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া শরিয়তে ধর্তব্য নয়। শরয়ী দণ্ডবিধির কোন দফাতেই এটি নাই। এ ধরনের কথা বলে কাউকে খুন করা বা কারও সম্পদ পুড়িয়ে দেওয়া স্রেফ ফেরেপবাজি। এগুলো ইসলামি দণ্ডবিধি ও শাস্তি-আইনে সংযুক্তি, বৃদ্ধি। যা করার এখতিয়ার কোন মানুষের নাই।
বর্তমান সময়ে মুসলমানদের কাজ হল, এমন ধরনের কথায় কান না দিয়ে ধৈর্য ধরে মানুষের কাছে শান্তির বাণী পৌঁছানো। এ ছাড়া আর যা করবে তাতে নিজের অপরাধের তালিকা শুধু দীর্ঘ হবে। নিজের ইসলামি জিম্মাদারী আদায় হবে না। 




এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন

close