শিরোনাম :

প্রচ্ছদ » সাহিত্য

রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ : সময়, অসময়, দুঃসময়ের অশ্বারোহী

শনি, ১৯ মার্চ'২০১৬, ২:৫১ অপরাহ্ন


রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ : সময়, অসময়, দুঃসময়ের অশ্বারোহী  
১৮ মার্চ সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমেদের ৩৭তম মৃত্যুবার্ষিকী  এবং লেখালেখির ১০০ বছর ও তাঁর অন্যতম গল্পগ্রন্থ আয়না প্রকাশের ৮০ বছর। এই দিবসে তাঁকে নিয়ে প্রিয় পাঠকদের জন্য লিখেছেন আশিক রেজা।
ঐতিহাসিক কোন ঘটনার ইন্টারপ্রিটেশন হাজির করার সময় কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা জরুরি, ঘটনার প্রেক্ষাপট ও ঐতিহাসিক প্রস্তুতি, বিদ্যমান ডেমোগ্রাফি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক অ্যাক্টরদের শক্তি, দৃষ্টিভঙ্গি ও আন্দোলনের অভিমুখ।এর কোন একটা বাদ দিলেই মিস-ইন্টারপ্রিটেশনের সম্ভাবনা। সে যেমন ঘটনার ইন্টারপ্রিটেশনের ক্ষেত্রে তেমনি এর যেকোনটির বিবেচনার ক্ষেত্রেও সত্যি। এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য ও বিধেয়-ভারত বিভাগের চূড়ান্ত পর্যায়ের একজন কর্মী এবং পূর্ব বাংলার জনগণকে একটি পূর্ণাঙ্গ জাতির পরিচয় সংগঠন প্রকল্পের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার যাপিত সময় ও কৃতকর্ম বিবেচনা, যিনি একইসাথে একজন কৃতি বুদ্ধিজীবী হিসেবে জাতির মনন গঠন ও মননশীল চাহিদা সৃষ্টি করেছেন এবং নেতা হিসেবে চাহিদাকে দাবীতে পরিণত করে আদায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি আবুল মনসুর আহমদ।
১৮৯৮ থেকে ১৯৭৯। আবুল মনসুর আহমদের বর্ণাঢ্য জীবনকাল। বাংলার, বাংলাসাহিত্যের, বাংলার সমাজ চেতনা, জাতীয়তার চেতনা, রাষ্ট্রচেতনারও বর্ণিল সময়। কোনোভাবেই সে সময় আজকের মতো নয়। বরং আজকের চেতনার যে স্তর, সুযোগ, যে সম্ভাবনা-তার ভূমিটি তৈরির, অসাধ্য সাধনের সময়। যে সময় কখনও মসৃন হওয়ার নয়। ভুল, দ্বন্দ্ব, সন্দেহ, প্রচেষ্টা, ব্যর্থতা, আশা ও আশাভঙ্গ, স্বপ্ন, সফলতা, ও সীমাবদ্ধতার জটিল সময়। সে সময়কে যথাযথভাবে চিহ্নিত করতে না পারলে ব্যক্তি, রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক আবুল মনসুরকে যেমন চেনা সম্ভব নয় তেমনি তার চেতনাকেও ভুলভাবে উপস্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তার জীবদ্দশায় বাঙালির আত্মপরিচয় অনুসন্ধান যেমন দৃশ্যমান হয়েছে, তেমনি গোত্র শাসনের বহুকাল পর, বিদেশী শাসকের শাসন হতে, ছদ্ম হলেও বাঙালির স্বশাসন নিশ্চিত হয়েছে। আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের ব্রতী একজন আবুল মনসুর গত হয়েছেন, কিন্তু তার লড়াই, তার ব্রত শেষ হয় নি বরং তা একটি নতুন স্তরে প্রবেশ করেছে। 
    
আজীবন জাতীয়তাবাদের কর্মী ছিলেন আবুল মনসুর। রাজনীতির মাঠ ছিল তার চাষের জায়গা। কিন্তু সে বর্গাচাষের। কেননা, জাতীয়তাবাদ শব্দটা কখনই বাংলার মানুষের হয় নি। সে বাঙালি-ই হোক আর বাংলাদেশী-ই হোক। বাংলায় জাতীয়তাবাদ শব্দটার আমদানি থেকে এ পর্যন্ত যে শস্য উৎপাদিত হয়েছে এবং যে সকল শস্য উৎপাদনের প্রকল্পের দ্বার উদ্ঘাটিত হয়েছে-তার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, মালিকানা জনতার নয় বরং মুখোশ পাল্টানো জমিদারদের।
বাংলার রাজনৈতিক ভূগোল ইতিহাসের অধিকাংশ সময় অনিবাসী ও নিবাসী ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের দখলে ছিল তা জানি। মানচিত্রটিও যে বর্তমানের মতো ছিল না-তাও অনেকের জানা আছে। কাজেই অনধিক এতটুকু বলা যায় যে, রাজনৈতিকভাবে পূর্ব ও পশ্চিম মিলে যে অখণ্ড ৮৮,৭৫২ বর্গমাইল বাংলা, তা কখনোই নিজের মতো একা ও একক ছিল না। ৪৩০০ বছরের পুরনো বাংলা যেমন অশোক, সমুদ্র গুপ্ত, শশাঙ্ক, মোগল শাসনামলে, তেমনি ১৭৬৫ সালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি গঠনকালীন বিহার, উড়িষ্যা, অখণ্ড আসাম (সেভেন সির্স্টাস) তো বটেই কখনও কখনও অযোধ্যা, উত্তর প্রদেশ (১৮৩১) থেকে বার্মা হয়ে মালয় সাগরের পেনাং পর্যন্ত অভিন্ন শাসনাধীনে ছিল। অন্যত্র মহাজনপদের পুন্ড্র, বঙ্গ, সমতট, হরিকেলের মতোই বিভক্ত ও স্থানীয় রাজন্য শাসিত। অতএব, শুধু বাংলায় নয় বরং এ অঞ্চলে জাতীয়তাবাদ গজিয়ে উঠবার সুযোগটুকু একেবারেই আধুনিক। প্রণোদনা তো অত্যাধুনিক। আর জাতীয়তাবাদের ব্যবসা একটি উত্তরাধুনিক ধারণা। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।
১৭৬৫ তে প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ক্ষয় কিংবা বাংলার একা হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৮৩১ সালে। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ভেঙ্গে উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ গঠনের মাধ্যমে। ১৮৭৪ সালে গঠিত হয় আসাম (আজকের সেভেন সিস্টারস) কমিশনারেট।যা আবার ১৯০৫-১১ সময়কালে বঙ্গভঙ্গের আওতায় সাময়িকভাবে পূর্ববাংলার সাথে যুক্ত হয়। ১৯১২ সালে বাংলা থেকে সর্বশেষ পৃথক হয়ে একক রাজ্য হয় বিহার ও উড়িষ্যা (যারা আরও পরে ১৯৩৬ সালে পৃথক হয়ে ২টি আলাদা রাজ্যের মর্যাদা লাভ করে)। অবশেষে বাংলা বহিরাঙ্গে নিজের মতো একা ও একক। কিন্তু ততক্ষণে বাংলার বিউগলে বিচ্ছেদী সুর বাজতে শুরু করেছে। পাকিস্তানের সাথে পূর্ববাংলার অন্তর্ভুক্তির মধ্যদিয়ে, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’র স্ফুলিঙ্গ অগ্নিকাণ্ড হওয়ার আগেই নিভে যায় ১৯৪৭ সালে। প্যান-বাংলার জমিনের ভূগোল চিরকালের জন্য পৃথক ও অপর হয়ে যায়। যেমন কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক ‘‘অসীমন্তিক’’ এ বলেছেন- ‘বলতে পারি, আবেগে আক্ষেপে সংক্ষেপে আর্তনাদ করে জানাতে পারি, কোন বিভাজন মেনে নেয়ে হবে না, কোন বিভাজনই প্রকৃত নয়। কিন্তু সত্য হলো বিভাজন ঘটে গেছে।’
আজকের বাংলাদেশে অবশ্য আমরা হীনমন্যতাকে অতিক্রম করে নিজস্ব হীনতাকে প্রকট করায় সচেষ্ট। প্রকৃতপক্ষে, এ আপাত ‘নিজস্ব হীনতা’ প্রকটের প্রচেষ্টার সার অলক্ষ্যে কতিপয় বিগতদেহী জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দের চরিত্রে আরোপনের অশুভ ইচ্ছাই প্রকট। সেও এক প্রকার হীনতা বটে। ক্ষুদ্রতা বটে। এ ক্ষুদ্রচিন্তনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সংগঠন ও বিভাজনের সামগ্রিক অনুঘটক, পাত্র-পাত্রী, সময়, আর্থ-সামাজিক অভিঘাত, ইতিহাসের পরম্পরা বিবেচনা যেমন উপেক্ষা করা হয় তেমনি নব্য সাম্রাজ্যবাদী পাকিদের বিরুদ্ধে পারম্পর্য্য জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে ১৯৪৭-এর ঘটনার ভ্রম-সংশোধন হিসেবে প্রত্যক্ষণের প্রয়াস দ্রষ্টব্য।
কিন্তু ১৯৪৭ সালের বাংলা বিভাগ যত না পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তি তার চেয়েও বাস্তবের আঘাতে সন্দিগ্ধ দোলন, আহত আদর্শের নিজস্ব বিশিষ্ট পরিচয় বিনির্মাণ প্রচেষ্টা। আর পাকিস্তান যে বাঙালি মুসলমানের ঘাড়ে বন্দুক রেখে শিকার, সে তো ঐতিহাসিক সত্য। সেই দোলনে বাঙালি মুসলমান যে দুলল, পশ্চিমা মুসলমানদেরকে শিকারের জন্য ঘাড় পেতে দিল-তা নিশ্চয়ই পরাজিত মানুষের প্রতীক।আবহমান বাংলার লালিত অসাম্প্রদায়িক আদর্শবাদী চেতনা ‘ক্ষণকাল’র জন্য যেন অচেতন হয়েছে, পরাজিত হয়েছে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে। এই ক্ষণিক অচেতন ঘাড়েই সওয়ার হয়েছে সিন্দাবাদের ভূত। ভৌতিক ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’। কাজেই বাঙালি মুসলমানের নিকট ৭১ মানে ৪৭-এ কৃত ভুলের সংশোধন নয়। বরং ৪৭-এর অসমাপ্ত দ্রোহ সম্পাদন এবং সিন্দাবাদের ভূতকে প্রতিশ্রুত আছাড় প্রদান। বলা ভালো একই সঙ্গে ‘১৯০৩-১২’ সময়ে যে ‘অসাম্প্রদায়িক বাংলা’কে অসম্ভব প্রতীয়মাণ হয়েছে ৭১’র বাংলাদেশ তারই দর্পিত বাস্তবায়ন।
আমরা উভয় বিষয় সতর্কতার সাথে বিবেচনা পূর্বক একটি পাঠ প্রস্তাব করছি।
০২
জাতীয়তাবাদ আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক উস্কানির বাইরে পরিস্কারভাবে, একটি সুবিধাবাদী প্রপঞ্চ। যা ধর্মের মতোই বিশেষ গোষ্ঠির হাতে সময়ে সময়ে, আম-জনতার নামে ব্যবহৃত হয়। প্রাথমিকভাবে, প্রত্যক্ষভাবে একটি সার্বজনীন আদর্শের পতাকা বহন করে। তবে শেষ পর্যন্ত তা, পুনরায় ধর্মের মতো গোষ্ঠির পতাকা, স্বার্থপরতার প্রতিশব্দ এবং সার্বজনীন স্বার্থ দলনের হাতিয়ার। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের স্বল্পায়ু এবং ক্ষীণকায়াটি পর্যাপ্ত আলোতে উপস্থাপন করলে; তা সহজেই দৃশ্যমান হয়।
কাকতালীয়ভাবে, উপমহাদেশে জাতীয়তাবাদী চেতনার রাজনৈতিক উন্মেষ, জনাব মনসুরের জন্মদশকে। আবার, আরো সুক্ষ্ম অর্থে, জাতীয়তাবাদী শস্যের প্রথম অঙ্কুর উদ্গম ও উদ্দিষ্ট চাষী মনসুরের জন্ম হয় অভিন্ন, ১৮৯৮ সালে। এই উদ্গম পর্ব, এক অর্থে ধর্ম নিয়ন্ত্রিত, পূর্ণ অর্থে মারাঠি নেতা লোকমান্য তিলকের কৃতিত্বমণ্ডিত। উপমহাদেশে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পিতা ও পরমপুরুষ তিনিই। কিন্তু প্রেরিত পুরুষ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী।
এ বিষয়ে অধিকতর আলোচনায় যাবার আগে, প্রসঙ্গত বলা ভালো, সুবিধাবাদের জমিন তৈরি হয়েছে শাসনযন্ত্র থেকে, প্রশাসন থেকে অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়-অভিজাত মুসলমানরা মুছে যাওয়ার পর, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার একক সুযোগে। আর অঙ্কুরটির বীজ বুনন ঘটেছে ১৮৩৭ সালে ইংরেজ শাসক বেন্টিক এর হাতে।বেন্টিক নিজের অজান্তে আন্দোলনের বীজ বপন করেছেন। পর্যাপ্ত আর্সেনিকযুক্ত পানি প্রবাহ ঘটেছে বঙ্কিমচন্দ্র হতে রবীন্দ্রনাথ হয়ে শরৎচন্দ্র প্রমূখ চন্দ্র সূর্যের হাতে। অফিস আদালতে স্থানীয় ভাষা ও লিপি ব্যবহারে তার আপাত নিরীহ নির্দেশনার মাধ্যমেই উপমহাদেশে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের গোড়াপত্তন। সকলে অবগত আছেন যে, ১২০১ সাল থেকে ১৮৩৭ সাল পর্যন্ত উপমহাদেশের দাপ্তরিক ভাষা ছিল ফার্সি। শুরুতে ফার্সি লিপিতে কোন সমস্যা না হলেও ১৮৫৭ সালের পর বিভিন্ন অঞ্চলে দেবনাগরী ও আরবি লিপি ব্যবহারকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলিম বিরোধ শুরু হয় যা কোন কোন ক্ষেত্রে দাঙ্গায় রূপ নিয়েছে। এসব সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি জাত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ছিল না কিন্তু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জমিন তৈরি করেছে। আর চেতনা শাণিত হয়েছে সিপাহী বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, বেঙ্গল রেনেঁসা, ব্রাহ্ম আন্দোলন প্রভৃতি সমাজবাদী চেতনার প্রভাবে। বিখ্যাত লেখক ও চিন্তাবিদ নিরোদচন্দ্র সি এর মতে অবিভক্ত ভারতের জাতীয়তাবাদ বিষয়ক নড়াচড়া ১৮৫৭ এর মোটাদাগে দুইভাগে বিভক্ত। প্রথমভাগ চূড়ান্তভাবে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের পরাজিত অভিজাত রাজশক্তির উত্তরাধিকারী ও তাদের পুনর্জীবন প্রত্যাশীদের ধর্মীয় পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলন। দ্বিতীয়ভাগ, প্রথমভাগে অর্জিত ধর্মীয় পুনর্জাগরণকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত। কিন্তু দাগ মুছে ফেলে ‘ঊনবিংশ শতাব্দি একটা প্রবল ধর্মান্দোলনের যুগ’ এবং রেনেসাঁর নায়করা নাম ধরে রামমোহন, কেশব, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, তিলক, গান্ধী, সৈয়দ আহমদ, সৈয়দ আমির আলী, নওয়াব আব্দুল লতিফ হয়ে সলিমুল্লাহ নিজ নিজ ধর্মের ধজ্বাধারী। তারচেয়েও গভীর কথা হলো, এদের সকলেই সমাজনেতা হওয়ার চেয়ে, ধর্মের চেয়েও নিজ নিজ (ব্রাহ্মণ কিংবা পতিত নওয়াব প্রমুখ) সম্প্রদায়নেতা হওয়ার চেষ্টা করেছেন।
শুনতে আজব শোনালেও একথা সত্যি যে, এ আন্দোলন পালে রাজনৈতিক বাতাস আহরিত হয়েছে ১৮২৮ সালের সহমরণ নিরোধ ও ১৮৫৬ সালের বিধবা বিবাহ জাতীয় কল্যাণমূখী কিন্তু ধর্মাচরণ সংক্রান্ত বিষয়ে শাসকগোষ্ঠির হস্তক্ষেপ থেকে (ফুল থেকে মৌমাছি প্রবণতায় মধু সংগ্রহ না করে মাকরসা প্রবণতায় বিষ সংগ্রহের মতো!)। ১৮৫৭ সালের বন্দুকের টোঁটাতে গরু-শুকরের চর্বি মেশানোর গুজব থেকে। অবশেষে, এ সকল ধর্মীয় পাঁচনের পথ বেয়ে ১৮৯১ সালে শিশু বিবাহ নিরোধ সংক্রান্ত সম্মতি আইন ও ১৮৯৬ সালে প্লেগ নিবারণী সরকারি ব্যবস্থাকে উদ্দেশ্যমূলক ব্যবহারের মাধ্যমেই জাতীয়তাবাদী শিশুর জন্ম হয়।
এ শিশু ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ নয়। কিন্তু ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ শিশুটির জন্মের কৃতিত্বও অভিন্ন পুরুষের। ‘লাল-বাল-পাল-ঘোষ’ সংঘের। যাদের একজন মারাঠি (তিলক), একজন পাঞ্জাবী (রাজপত রাই)। ১৯০৩ সালে, ‘বাংলা ভাগ’ সংক্রান্ত বৃটিশ পরিকল্পনা প্রকাশের প্রতিক্রিয়া শুরু হওয়া ‘স্বদেশী আন্দোলন’ মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার চাষ-বাস আরম্ভ হয়। ১৯১২ সালে বাংলার পুনঃ একত্রীকরণের মাধ্যমে আপাত সাফল্য অর্জিত হয়। কিন্তু উদ্দেশ্যের মহত্ব, সার্বজনীন আবেদন থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত আবেগ, অদূরদর্শীতা ছাড়াও আন্দোলনকে ধর্মীয় চেহারাদান ও গোষ্ঠি বিশেষের স্বার্থ সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি প্রকট হওয়ায় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গবাসী (বিশেষত মুসলমান)দের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ায় শুরুতেই ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’র শিশুটির মৃত্যু ঘটে। অন্যত্র, বলা হয় বঙ্গভঙ্গ ও বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন মূলত পূর্ববঙ্গীয় বিকাশমান মুসলিম মধ্যবিত্তের সাথে প্রতিষ্ঠিত হিন্দু মধ্যবিত্তের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্ব হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ বলা হলেও আগাগোড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির স্বার্থ পরিপন্থি, অদূরদর্শী বিবেচিত ও পুরোমাত্রায় সামগ্রিকরূপ লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ প্রসঙ্গে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে যথার্থই বলা হয়েছে যে, বঙ্গভঙ্গ কাণ্ডে জড়িত সকলপক্ষই পরাজিত হয়েছে। সবচেয়ে শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ ধারণার। আক্ষরিক অর্থেই ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ একটি অঙ্কুরে বিনষ্ট ধারণা। এখন যা অবশিষ্ট আছে, তা হলো দোমড়ানো আবেগ, পুড়ে যাওয়া আবাস, ভেসে যাওয়া দিবস ও রজনীর নষ্টালজিয়া।
০৩
১৭৫৭ সালে বাংলার পতনকে অনেকে হয়তো বাংলার মুসলিমদের পতন ভাবতে পছন্দ করেন কিন্তু পতন ঘটেছে উচ্চমর্ণ অনিবাসী মুসলমানদের, সত্যিকার অর্থে বাংলার স্থানীয় মুসলমানগণ তৃতীয় সাড়িতে, নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সাথেই ছিল। মণিষী আহমেদ ছফার ভাষায় ‘রক্ত এবং ভাষাগত দিক দিয়ে স্থানীয় জনগণের সাথে তাঁদের কোন সম্পর্ক ছিল না। তাদের সঙ্গে বাঙালি মুসলমান জনগণের একমাত্র ধর্ম ছাড়া আর কোন যোগসূত্র ছিল না’। আহমদ ছফার বাক্যের যথার্থতার সাক্ষ্য দিচ্ছেন ১৮৭২ এ প্রথম অফিসিয়াল আদমশুমারির কমিশনার হেনরি বেভারলি, ১৯০১ সালের আদমশুমারির কমিশনার ই.এ. গেট, নৃতাত্ত্বিক বুকানন হ্যামিলটন ও ঢাকার তদানিন্তন সিভিল সার্জন ড. জেমস্ ওয়াইজ। কাজেই শাসকের পতনের ফলে লাভবান হয়েছে উচ্চকোটির সহযোগী, সুবিধাবাদী দ্বিতীয় সারির উচ্চবর্ণ হিন্দু সম্প্রদায় মাত্র। কারণ, নৃতাত্ত্বিক বিবেচনায় এবং বহিরাগত মুসলিম শাসকরা প্রশাসনের বিন্যাস পরিবর্তন না করায়- ‘মুসলিম শাসনমলেও বাঙালি মুসলমানেরা রাজনৈতিক, আর্থিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে নিগৃহীত ছিলেন। ইংরেজ আমলে উঁচু শ্রেণীর মুসলমানরা সম্পূর্ণভাবে সামাজিক নেতৃত্বের আসন থেকে বিতারিত হলে উঁচু বর্ণের হিন্দুরা স্বাভাবিকভাবেই সে আসন পূরণ করেন’ (বাঙালি মুসলমানের মন’ আহমেদ ছফা)
কারণ- 
“…there is abundant evidence that Indian communities failed, upon Islamization, to iprove their status in the social hierarchy. On the contarary, most simply carried into Muslim Society the same birth-ascribed rank that they had formerly known in Hindu Society. This is especially true of Bengal. As James Wise observed in 1883”
কাজেই-‘এই উঁচুকোটির মুসলমান প্রশাসকেরা এদেশীয় যে শ্রেণিটির সহায়তায় বাংলা দেশের শাসনকার্য পরিচালনা করতেন, তারা প্রায় সকলেই ছিলেন স্থানীয় উঁচুবর্ণের বাঙালি ব্রাহ্মণ, কায়স্থ কিংবা বৈদ্য শ্রেণির লোক’ (বাঙালি মুসলমানের মন, আহমেদ ছফা)
সেই ১২০৪ থেকে সমগ্র তুর্কি, আফগান, মোগল শাসনামলেই কায়স্থ ও বৈদ্য শ্রেণির জন্য এবং ১৪১৫ সাল থেকে ব্রাহ্মণদের জন্য একথা প্রযোজ্য। একে লাভবান হলে অন্যের দুঃখ পাবার কিছু নেই। কিন্তু অতিরিক্ত সুবিধা লাভের আশায় অভিজাত (আশরাফ) শাসক শ্রেণির সাথে ইতর (আতরাফ) শাসিতকে এক পাল্লায় জাহির করার হীনপ্রচেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে সেই মহিমান্বিত ঊনিশ শতকের গোড়ায়। আগেই বলেছি গোটা উনিশ শতক ছিল অভিজাতবর্গের ধর্মীয় আন্দোলন। অনেকেই মনে করেন যে, সামাজিক বিন্যাসের এ ভুল ইন্টারপ্রেটেশনের উদ্বোধন করেন রাজা রাজ মোহন রায়ের মতো বিখ্যাত সমাজ সংস্কারক। তবে গোড়াতে তা ততটা জোরদার ছিল না। যদিও বাংলা বরাবরই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবুও একে এ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণ মুসলিম আমল হতেই শাসনতান্ত্রিক সুবিধা থেকে (অভিজাত মুসলমান ও উচ্চবর্ণের হিন্দু শাসিত প্রশাসনের কারণে) শতহস্ত দূরে থাকতে বাধ্য হতো। নব্য ব্যবস্থায় ১৮০১ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপিত হলে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮১৭ সালের হিন্দু কলেজ আর ১৮২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃত কলেজে মুসলিম তো মুসলিম- ব্রাহ্মণ আর বৈদ্য বাদে অন্য কোন  বর্ণের ছাত্র, শিক্ষক কিংবা কর্মচারীর প্রবেশ অধিকার ছিল না। উনিশ শতকীয় বেঙ্গল রেনেঁসার প্রথমভাগে এ তিনটি প্রতিষ্ঠানের পৌরহিত্যে অপ্রতিরোধ্য গতিতে বেড়ে ওঠে কোলকাতা কেন্দ্রিক ইংরেজি শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত। যাদের সংগঠন মোঘলদের নিকট হতে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ইংরেজদের নব্য প্রশাসনের উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ, দালাল, বেনিয়া, ফরিয়া, ব্যবসায়ী, কেরানি দ্বারা। যারা পরিবর্তিত অবস্থাকে ৬০০ বছরের মুসলিম শাসনের অবসানে স্বশাসন অর্জনের প্রথম অধ্যায় জ্ঞান করে এসেছে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহকাণ্ডে ভারত শাসন কোম্পানির নিকট থেকে রানীর নিকট অর্পিত হলে, পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনের নানা পর্যায়ে অভিঘাত তৈরি হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা মাদ্রাসা, ব্রিটিশ সমর্থিত সৈয়দ আহমদের আলিগড় কলেজ। এই সুযোগে বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায় তাদের উত্তর ভারতীয় অভিজাত জাতভাইদের ফাঁক গলে শিক্ষা ও সরকারি প্রশাসনে অনুপ্রবেশের সুযোগ লাভ করে। এসবের প্রত্যক্ষ ফলের একটি হলো কোম্পানির অন্যান্য প্রেসিডেন্সির মতো বাংলায় মুসলিম মধ্যবিত্তের প্রাথমিক গঠন ও বিকাশ। করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা যায় যে, ১৮৮২-৮৩ সালের তুলনায় ১৯১২-১৩ সালে পূর্ববাংলার স্থানীয় ধর্মান্তরিত মুসলমান বংশদ্ভূত ছাত্র সংখ্যা ৭৪% বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এ অভিঘাতে প্রদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক একক দখলে সংখ্যাগুরু ও প্রতিদ্বন্দ্বি জনগোষ্ঠির আবির্ভাব উৎপাত হিসেবে বিবেচনা করেছে ব্রাহ্মণ-বৈদ্য-কায়স্থ নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠিত মধ্যবিত্ত সমাজ। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রাক্তন শাসক অভিজাত মুসলমানদের সাথে তৃতীয় সারির, শাসিত মুসলমানদের এক সারিতে উপস্থাপনের উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভুল, হিংসা এবং প্রাগৈতিহাসিক ঘৃণা। এই ঘৃণার পাঁচনকে প্রায় অর্ধশত বছর ধরে অতিযত্নে বিষে পরিণত করেছেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম সফল ঔপন্যাসিক ঋষি বঙ্কিম চন্দ্র।সে বিষ এত তীব্র যে অনেকে তাকেই বাংলাভাগের কুশিলব মনে করেন। 
‘বাংলাভাগের জন্য সম্ভবত বঙ্কিমচন্দ্র প্রধানতম দায়ী’
বাংলার সাহিত্য দর্শন, নির্বাচিত প্রবন্ধ, আহমেদ ছফা, মাওলা ব্রাদাস, ২০০২
অন্যদিকে, প্রাবন্ধিক আনিসুজ্জামানের মতে, বঙ্কিম যে বাস্তবতার সন্তান। তাতে তাঁর মুক্ত দৃষ্টি অবলম্বনের উপায় ছিল না।
বাঙালি মুসলমানের কতটা উপকারে লেগেছেন তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু মাকরসা বঙ্কিমচন্দ্রের বিষের কিছু সাপ্লাই দিয়েছেন মুঘল অপভ্রংশ, আলিগর আন্দোলনের প্রাণপুরুষ স্যার সৈয়দ আহমদ। আলিগর আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের ‘গাছেরটা খাওয়া তলারটা কুড়ানো’ হিন্দু মধ্যবিত্তের ‘বৃত্তের বাইরে’ প্রমাণের মানসে-আলাউদ্দিন খিলজি রচিত কিল্লার ভাষা, ফার্সি মিশ্রিত/প্রভাবিত হিন্দি কিংবা হিন্দি মিশ্রিত ফার্সি কে আরবি হরফে লেখার বায়না তুলে। কিন্তু তখন পর্যন্ত বাঙালি মুসলমান জনসাধারণ রাজনৈতিক হিসাব-কিতাব হতে শতহস্ত দূরে, কেবলই ঘৃণার বস্তু হিসেবে বিদ্যমান ছিল। তাঁর আলিগরে, কলকাতা মাদ্রাসায় আতরাফ (স্থানীয় ধর্মান্তরিত) মুসলমানদের জন্য পৃথক ক্লাস (কলিঙ্গ শাখা) সৃষ্টি করতে হয়েছিল। এক ক্লাসে জায়গা হয় নি!
১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গের দিন Mohammedan Provincial Union  কিংবা ১৯০৬ সালের ২৭-৩০ ডিসেম্বরের মুসলিম লীগ, ঢাকার একজন সলিমুল্লাহ অধ্যক্ষে গঠিত হলেও বাঙালির ছিল না। তবে বাঙালি মুসলমানের অন্যতম রাজনৈতিক স্কুল ছিল তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। যে স্কুল বাঙালি মুসলমানের আবেগ এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জকে লক্ষ্য করেই গড়ে ওঠে। আবার উল্টোদিকে ব্রাহ্মণ-কায়স্থ সংঘ কংগ্রেসের মুসলিম সংস্করণ-মুসলিম রাজা, জমিদার, নওয়াবজাদা, পীর, পীরজাদা, আলিগর- দেওবন্দী মোল্লা আর ব্যারিস্টারদের লীগ; তাদের প্রয়াসে পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম কমিউনিটিতে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবেচনা শুরু হয়। কিন্তু একে মুসলিম লীগ পূর্বাপর উচ্চমর্ণ অভিজাতদের দল, তায় তাদের অধিকাংশের মাতৃভাষা, পারিবারিক ভাষা ছিল উর্দু। আবার তাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সর্বসাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল। বিধায় তা যেমন বঙ্গভঙ্গরোধ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে তেমনি বাংলায় জোরদার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সার্বজনীন সংস্কারের জোরদার আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে নি। তবে তাদের কান্নাকাটির ফলেই ১৯০৯ সালের ‘মর্লি-মিন্টো সংস্কার’ আইনে পৃথক কমিউনাল ইলেক্টরেট বা মুসলিম কাউন্সিলর নির্বাচনের এবং মিউনিসিপ্যালিটি ও জেলা বোর্ডে মুসলিম আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা জারি হয়। যদিও এ আইন অন্য অনেক ইস্যুর মতো বাংলা অন্যান্য প্রেসিডেন্সিতে হিন্দু-মুসলিম বিরোধকে চাগিয়ে তুলেছে বলেই অনেকে মনে করেন। তবু বাঙলায়, বিশেষত, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম কমিউনিটির স্বার্থ সংরক্ষণে এর গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯০৯ সালের আগের বাংলায় মুসলিম প্রতিনিধিত্ব ছিল মাত্র ৫%। এর পথ বেয়েই এসেছে ১৯১৬ সালের লক্ষ্ণৌ প্যাক্ট। এ চুক্তি অনুসারেই ১৯১৯-এ গঠিত লেজিসলেটিভ এসেম্বলিতে ৫৬% মুসলমানের জন্য ৪০% আসন অর্জিত হয়। বলা যায় এ পথ বেয়েই উনিশ শতকের হিন্দু মধ্যবিত্ত বিরচিত চক্রব্যুহ ভেঙ্গে বাংলার মুসলিম মধ্যবিত্তের বিকাশ সম্ভব হয়েছে। বলা চলে বঙ্কিমীয় সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের খাড়া থেকে গর্দানটাকে রক্ষা করেছে। পূর্ববঙ্গীয় রাজনৈতিক তাজ জনাব শেরেবাংলার মতো সূর্যের উদয় সম্ভব হয়েছে। যিনি কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের জমিদারি রাজনীতির বিপরীতে আমজনতার রাজনীতি করেছেন। প্রতিষ্ঠিত স্বার্থবাদী অভিজাতদের বিপরীতে সাধারণ কৃষক শ্রমিকের প্রয়োজনকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। প্রকৃতপক্ষে শেরেবাংলার পথ বেয়েই বাংলায় সার্বজনীন রাজনীতির পথযাত্রা। যার অভাবে ১৯১২ বঙ্গভঙ্গরদ হয়। সে কথায় পরে আসছি। এই পর্যায়ের শেষ কথা হলো বঙ্গভঙ্গ হয়তো ভুল ছিল। কিন্তু রদের পদ্ধতিটি নিজের পায়ে কুড়াল মারার চেয়েও বেশি কিছু। তার চেয়েও সত্যি কথা হলো বঙ্গভঙ্গ রদ সম্ভব হয়েছে। কারণ আমভারতের সবেধন নীলমনি কংগ্রেস যেমন তেমন বেঙ্গল কংগ্রেস রাজা, জমিদার, ব্যারিস্টারদের স্বার্থসিদ্ধির ক্লাবমাত্র ছিল। আমজনতার নয়। আর বাংলার আমজনতার (যাদের অধিকাংশই দুর্ভাগ্যক্রমে ছিল মুসলমান) সে পর্যন্ত না কোন পার্টি ছিল, না কোন জাতীয় সংগঠন, না পাড়ার সমিতি ছিল। আন্দোলনের কোন শিক্ষা, উদাহরণ, অভ্যাস কিছুই ছিল না। অন্তত সে পর্যন্ত। তার উপর বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’র নামে, সংস্কৃতি রক্ষার নামে যে সন্ত্রাসী বিপ্লববাদের জন্ম ও লালন করা হয়েছে।
০৪
বাঙালি চিরকালই নিজের পা কেটে অপরের যাত্রা ভঙ্গ করতে সিদ্ধহস্ত। আর সেটা তারা শুরুতেই করতে পছন্দ করে। এই লেখার শুরুতেই বলেছিলাম ‘জাতীয়তাবাদ’র ব্যবসা একটি উত্তরাধুনিক ধারণা। আমরা জানি, সকলের জন্য যেটা সত্যি, বাঙালির জন্য তা সত্যি নয়। সে সবচেয়ে ভাল বুঝতে পেরেছিলেন বিশ শতকের ‘শনিতে পাওয়া প্রথম দশকে’ কংগ্রেসের দায়িত্বপ্রাপ্ত ও মহাত্মাগান্ধীর গুরু জনাব গোপাল কৃষ্ণ গোখলে। সেই জন্যই বলেছিলেন, ‘আজ বাঙালি যা ভাবে, অবশিষ্ট ভারত তা ভাবে আগামীকাল’। বাঙালি ‘জাতীয়তাবাদ’র আলাপ শুরু করেছে-দোকান খুলে। ঠিক যেমনটি আমাদের আলোচ্য জনাব আহমদ তাঁর ‘সায়েন্টিফিক বিযিনেস’ গল্পে উল্লেখ করেছেন। বাঙালি দোকান খুলেছে ‘জাতীয়তাবাদ’র আর পণ্য হলো ‘বৈদিক ধর্ম’। গুনে গুনে দোকানদারদের চেহারাগুলো দেখুন-অনুশীলন সমিতি, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির (মুসলমান) প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল, জনাব বাল গঙ্গাধর তিলক, যিনি ইতোপূর্বেই ধর্মীয় অপব্যাখ্যা দিয়ে বৃটিশ চিকিৎসক (প্লেগকাণ্ডে) খুনের অভিযোগে জেল খেটেছেন। এ পর্যায়ে তিনি বাংলায় মারাঠি নেতা শিবাজিকে আমদানি করলেন। আর আরেক নেতা অরবিন্দ ঘোষ আন্দোলনকে পুরোমাত্রার ধর্মাচরণে পরিণত করেন। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির জাতীয়তাবাদের মন্ত্র হিসেবে আমদানি করলেন, বঙ্কিমচন্দ্রের মুসলিম বিদ্বেষী উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’র চেতনা, ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতের-
‘বাহুতে তুমি মা শক্তি
হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি
তোমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে
ত্বংহি দূর্গা দশপ্রহরণ ধারিণী’
এনাদের ‘সন্ত্রাসী বিপ্লব’ শাখার সেনাপতি জনাব বারিণ ঘোষ। যিনি লিখিতভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ’র আন্দোলনকে ‘হিন্দু রাজত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা’র প্রচেষ্টা হিসেবে দেখতে ও দেখাতে চেয়েছেন। এই বাতাসের অনুকূলেই পাল তুলেছিলেন কবিগুরুও। জাতীয়তাবাদ যে সংকীর্ণ চেতনা, তারও সংকীর্ণ কোণে সংখ্যালঘু স্ট্যাবলিশমেন্টের বেড়া ডিঙিয়ে সাধারণের প্রয়োজন ও আবেগকে মূল্য দিয়ে নিজেকে ‘বড় মানুষ’ হিসেবে প্রতিপন্ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন বাংলার ‘সবচেয়ে বড় লেখক’, যেমন ব্যর্থ হয়েছেন অন্যান্য সাধারণ রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী, সাহিত্যকর্মীরা। বাঙালি মুসলমানের বিকাশ রোধের জন্য, অন্ধভাবে ঐক্যের গোড়া কেটে দিতে, সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতে কেউ দ্বিধা করেন নি। বঙ্গভঙ্গে পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অর্থনৈতিক, শিক্ষা, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানগত প্রত্যক্ষ অভিঘাতের প্রতি আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের স্পর্শকাতরতার অভাব যেমন ছিল চোখে পড়ার মতো, একই সঙ্গে কলকাতাকেন্দ্রিক স্ট্যাবলিশমেন্টের স্বার্থরক্ষার প্রয়াসও আন্দোলনের একটি দূর্বল দিক হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। এভাবে ৮৮০০০ বর্গমাইলের মধ্যে ৫৬০০০ বর্গমাইলের প্রয়োজন অস্বীকারের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অঙ্কুরটিকে, এর সমর্থকরাই বিনষ্ট করেছেন। গোড়া কেটে দিয়েছেন। পরবর্তীকালে তাই, বাঙালি জাতীয়তাবাদ সংক্রান্ত যতটুকু নড়াচড়া, সেই গোড়াকাটা গাছটিকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা হিসেবেই পরিগণিত। তবে সেসকল প্রচেষ্টাও পূর্ববৎ। যাই হোক, বঙ্গভঙ্গকাণ্ডে বাঙালির ঘর পোড়া গেল বটে কিন্তু ছাড়পোকা সাফ হলো। বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে ভাবালুতা ছিল, অহিন্দু বাঙালিরা এর ফলে তা কাটিয়ে উঠলো। গুরুত্ব বিচারে বঙ্গভঙ্গের এতটুকুই আউটকাম। এ আন্দোলনের উদ্যোক্তাদের বগল বাজানোর কথা ১৯১২ সালে। কিন্তু কতটা বগল তারা বাজাতে পেরেছেন। সে বিষয়ে আমরা সন্দিহান। কেননা এর দীর্ঘমেয়াদী ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়া ততক্ষণে শুরু হয়েছে। মহাত্মা নবাব সলিমুল্লাহ’র পৌরহিত্যে ১৯০৮ সালের ৩০-৩১ ডিসেম্বর সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের সভায় মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচনের প্রস্তাবমতে, ১৯০৯ সালের মর্লি-মিন্টো সংস্কারের বদৌলতে বাঙালি মুসলমানরা মিউনিসিপ্যালিটি, জেলা বোর্ডগুলোতে জায়গা করে নিতে শুরু করলেন। বলা ভালো, ব্রাহ্মণ স্ট্যাবলিশমেন্টের বন্দিশালার তালাভাঙ্গা এই পদক্ষেপের পর বাংলার রাজনীতি যে কোন বিচারেই আগের মতো থাকা অসম্ভব ছিল। বঙ্গভঙ্গ থেকে বাঙাল পেয়েছে সামান্যই, কিন্তু অহিন্দু মধ্যবিত্তের বিকাশ ও লেভেলপ্লেইং ফিল্ড তৈরি কিংবা আজকের বাংলাদেশের বীজ ওখানেই পোতা হয়েছে। যা মহিরুহে পরিণত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনকিউবিটরে।
আগেই বলেছি, উনিশ শতক পুরাদমে ধর্মান্দোলনের শতক। বাংলার হিন্দু-মুসলমান না চাইলেও তার করাতকলে কাটা পড়েছে। হিন্দুর সৌভাগ্য ব্রাহ্মণ হলেও তারা মাটির সন্তান ছিলেন। বাঙালি মুসলমানের যারা নেতৃত্ব করেছেন, তারা নেতা ছিলেন বটে বাংলার মানুষ ছিলেন না। শিল্প-সাহিত্যেও মুসলিম বাংলার দুর্ভাগ্য, সবেধন নীলমনি মীর মশাররফ হোসেন, কায়কোবাদ প্রমুখ। বাংলার শিল্প, সাহিত্য ও রাজনীতির পাঙ্খাবরদারদের গুটিকতকের প্রায় সবাই নিজেদের উড়ে এসে জুড়ে বসা উদ্বাস্তু প্রমাণের অর্থহীন চেষ্টাই করেছেন।
১৯১১ সাল বাঙালি মুসলমানের ভিত্তি বছর। এ বছর ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লা, আব্দুল্লাহ খ্যাত কাজী ইমদাদুল হক, শান্তিপুরের কবি মোজাম্মেল হক, ‘দি মুসলমান’ সম্পাদক মুজিবুর রহমান খান (১৮৭৩-১৯৪০; ইনি আবুল মনসুর আহমদকে একই পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতায় প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন) এবং মাওলানা আকরম খাঁ প্রমুখ গঠন করেন ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’। এই সমিতির সভ্যরাই ১৯৪২ সালে ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেঁসা সোসাইটি’ গঠন করেন। যে সংগঠন পাকিস্তানকে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক চেহারা দিয়েছে। বলা ভালো এই রেনেঁসা সোসাইটির সদস্য ছিলেন আবুল মনসুর আহমদ এবং ‘পাকিস্তান (১৯৪২)’ খ্যাত সাংবাদিক মুজিবুর রহমান খাঁ (১৯১০-৮৪)। ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর সম্রাট পঞ্চম জর্জ বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা দিলেন বটে একদিকে বাংলার কেটে আসাম, বিহার, উড়িষ্যা ও ছোট নাগপুরকে আলাদা করা হলো অন্যদিকে রাজধানী সরিয়ে নেয়া হলো দিল্লিতে। একই সঙ্গে কলকাতার স্ট্যাবলিশমেন্টের মুখ চুন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (সলিমুল্লাহকে স্বান্তনা দেয়ার জন্য!) প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হলো। যে বিশ্ববিদ্যালয় একদিকে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক। আহমদ ছফার ভাষায়, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান তিনটি অবদানের একটি হলো পাকিস্তান আন্দোলনের মনোস্তাত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিতটি তৈরি করা, দ্বিতীয় অবদান বাংলাভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দান এবং তৃতীয় অবদান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংকল্প ও কর্মপন্থার দিকনির্দেশনা’। ১৯১১ সালেই কংগ্রেসে যোগদানের মাধ্যমে রাজনীতি শুরু করেন বাঙালি মুসলমানদের প্রথম রাজনীতিবিদ শেরেবাংলা ফজলুল হক।
আবুল মনসুর আহমদের নিজস্ব সূত্রে জানতে পারি- যে তিনি ১৯১১ সালে প্রজাসভা এবং ১৯১৪ সালে কৃষক প্রজা সম্মেলনে যোগদান করেন। বলা বাহুল্য এসকল প্রজাসভা/সম্মেলন বঙ্গভঙ্গ ও মর্লিমিন্টো সংস্কার আইনের পরম্পরা। কেননা এসকল প্রজা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মুসলমান এবং ততদিনে মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। যা একধাপ এগিয়ে ১৯১৬ সালের লক্ষ্ণৌ প্যাক্টে পাকাপাকিভাবে প্রাদেশিক সংসদে ৪০% আসনে স্থিতি লাভ করে। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব নিশ্চয়ই মানবিতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বাঙালির নিষ্কম্প জীবনেও তার প্রভাব অনুপস্থিত নয়। বরং ১৯১৮ সাল থেকেই রুশ বিপ্লবের প্রভাবে বাংলায় শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয়। ১৯১৯ সালে বাংলায় প্রথম সংসদ ও মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। যে মন্ত্রিসভার মন্ত্রী হন বাংলাপ্রেমিক নওয়াব আলী চৌধুরী। ১৯২৪ সাল নাগাদ মন্ত্রীসভায় আসন গ্রহণ করেন শেরেবাংলা ফজলুল হক। ১৯২৫ সাল বাঙালির চির দুঃখের বছর। শুধু যে পরপর ১৬টি দাঙ্গায় বাংলার বিভক্তি রেখাটি রক্তে আঁকা হয় তাই নয়। চিত্ত রঞ্জন, শরৎ বসু, শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দীর যত্নে গড়া বেঙ্গলপ্যাক্ট-এর অকাল মৃত্যু হয় চিত্তরঞ্জনের সাথে। সেই সাথে যুক্তবাংলার কফিনেও শেষ পেরেকটি গাঁথা হয়ে যায়। পরের বাইশ বছর শুধু বিভক্তিটাকেই সত্য করে তোলার বছর। কোন বিভক্তি, কোত্থেকে এল সে? অনেক কথাই বলেছি উপরে। আরও স্পষ্ট করে বললে, অভিন্ন কারণে বাংলা ভাগ এবং পাকিস্তানের সাথে বাঙালির একশ আশি ডিগ্রীতে অবস্থান।
শুধু রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বাঙালি মুসলমানদেরকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টাই করে নি পশ্চিম বঙ্গীয় ব্রাহ্মণ স্ট্যাবলিশমেন্ট। রাম মোহন থেকে বঙ্কিমচন্দ্র হয়ে শরতচন্দ্র পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের চন্দ্রসূর্যবৃন্দ বাঙালির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে প্রায় অস্বীকার করেছেন। বঙ্কিম অচ্ছুৎ বাঙালি মুসলমানদের ঘৃণা করতেন সবাই জানে, রবীন্দ্রনাথ তার স্ট্যাবলিমেন্টের সাথেই ছিলেন (বলা ভালো, এঁরা সর্বাংশে ব্রাহ্মণ ছিলেন, রবীন্দ্রনাথের সমস্যা একটু বেশিই ছিল। তৃতীয় প্রজন্মের ব্রাহ্ম নিজেকে হিন্দু প্রমাণের দায়ও তাঁর ছিল)। একশ’ বছর ধরে উচ্চকিত এ স্বর শরৎ চন্দ্রে এসে ব্যক্তি বিশেষের বদলে সম্প্রদায়ের হয়ে যায়। তিনি ১৯২৩ সালে স্বশরীরে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনে দাশের নিকট ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’র এর বিরুদ্ধে যা করেছেন তা বাঙালি জানে (বাঙাল হয়তো ভুলে গেছে!), ১৯২৬ সালে বেঙ্গল কংগ্রেসের কৃষ্ণনগর অধিবেশনে ‘ বর্তমান হিন্দু-মুসলমান সমস্যা’ নামে উপস্থাপিত মুসলিম বন্দনার উদাহরণ-
“Hindus, high or low, were born with culture, whereas Muslims were born without it! Worse still, Muslims could not even attain it, however much they tried. Their lack of culture accounted for their general behaviour which, according to him (Sarat Chandra), was characterised by “brutality, barbarism and fanaticism”
বাঙালি মুসলমান জন্মন্তরে বিশ্বাস না করতে পারে। কিন্তু সন্দেহ নাই এ অন্ত্যজ জন্মের ফল, নিজের জন্মভূমিকে ‘দারুল হারব’ ঘোষণার ফল, কোটি কোটি স্বদেশির দুর্গতি উপেক্ষা করে, খেলাফতি মাকালের ‘ভূখণ্ড বহির্ভূত আনুগত্যে’ আত্মহারা হওয়ার ফল। এ জনমে পশ্চিমবঙ্গ, কলকাতার কলে পূর্ববাংলার হিন্দু-মুসলিম আমজনতার পরিচয় সংক্রান্ত ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বাঙালি-বাঙাল’ কৌতুক সবারই জানা। কিন্তু জানা নেই সমাজের প্রকৃত মানসিকতা। যেমন,
 “তাঁহার (রবীন্দ্রনাথের) যৌবনকালে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীর পক্ষে পূর্ববঙ্গের কন্যা বিবাহ করা প্রায় ইংরেজের দেশী মেয়ে বিবাহ করার মতো ছিল”
-আত্মঘাতি রবীন্দ্রনাথ, নিরোদ সি. চৌধুরী, পৃষ্ঠা-৬৮-৬৯
এরুপ বিশ্বাসের ঐতিহাসিক কারণ, হিন্দু-অহিন্দু- মুসলমান নির্বিশেষে পূর্ববঙ্গীয়দের পরিচয় নির্ধারণে ১৯৩৮-১৯৬০ পর্যন্ত তিনটি নৃতাত্ত্বিক গবেষণার ফল এই রকম- ÒEast Bengal groups, both Muslim and non-Muslim, differed fundamentally from West Bengalis.
জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক এর মতে, “তখন পরিস্থিতি ছিল অন্যরকম”। যে পরিস্থিতি এই একশ বছর পরের বাংলায় অকল্পনীয়। কাজেই অন্যরকম সময়ে অন্যরকম সিদ্ধান্ত ও ফল ফলাই স্বাভাবিক। একই স্বাভাবিক ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে ‘পশ্চিম বঙ্গ’কে প্রতিস্থাপনকারী মুসলমান নামের ‘পশ্চিম পাকিস্তান’র সাথে। কেমন? পশ্চিম বঙ্গের অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত পরিস্থিতি দিয়ে শেষ করেছি। সেখান থেকেই শুরু করি। ১৯৬৮ সাল নাগাদ পাকিস্তানের দুই অংশের উন্নয়নচিত্র নিম্নরুপ:
 
বিবরণ                                পশ্চিম পাকিস্তানে                                       পূর্ব পাকিস্তানে
১.        জনসংখ্যা                  ৫ কোটি ৫০ লক্ষ                                        ৭ কোটি ৫০ লক্ষ
২.        ডাক্তারের সংখ্যা       ১২৪০০                                                          ৭৬০০
৩.        হাসপাতালের বেড    ২৬০০০                                                          ৬০০০
৪.        পল্লীস্বাস্থ্য কেন্দ্র             ৩২৫                                                               ৮৮
৫.        শহর সমাজসেবা কেন্দ্র    ৮১                                                                 ৫২
৬.        প্রাথমিক স্কুল                ১ম ২০ বছরে ৩৫০ গুন বৃদ্ধি                       স্কুল সংখ্যা হ্রাস
৭.        ছাত্র সংখ্যা                     ১৯৪৭ সালে বাংলার অর্ধেক ছিল,      ১৯৪৭ সালের তুলনায় ৫ গুন বৃদ্ধি
                                                কিন্তু পরবর্তী ২০ বছরে ৩০ গুন বৃদ্ধি                                                                                                               
৮.        কেন্দ্রীয় সরকারের 
কার্যালয়সমূহ                            সমস্ত সামরিক/বেসামরিক হেডকোয়ার্টার                 একটিও না
 
৯.        গবেষণা ও উন্নয়নকেন্দ্র                            ১৩টি                                   ৩টি
১০.        কেন্দ্রীয় বেসামরিক চাকুরী                   ৮৪%                                         ১৬%
১১.        বৈদেশিক চাকুরী                                  ৮৫%                                     ১৫%
১২.        স্থলবাহিনী                                             ৯৫%                                 ৫%
১৩.        নৌবাহিনী(কারিগরী)                            ৮১%                                      ১৯%
১৪.        নৌবাহিনী(অকারিগরী)                          ৯১%                                        ৯%
১৫.        বৈমানিক/বিমান সেনা                          ৮৯%                                       ১১%
১৬.        সশস্ত্র বাহিনী                                    ৫০০০০                                    ২০০০০
১৭.        পাকিস্তান এয়ারলাইন্স                           ৭০০০                                      ২৫০
১৮.        চালের দর(প্রতি মন)                             ১৮ টাকা                              ৫০ টাকা
১৯.        গমের দর(প্রতি মন)                              ১০টাকা                               ৩৫ টাকা
বাঙালির বিক্ষণ, অনুভূতির গভীরতা, স্পর্শকাতরতা, সহনশীলতার সাথে অন্যায়কে বিনা প্রতিবাদে সহ্য না করার ইতিহাসও অনেক দীর্ঘ। মৎসভূক বাঙালির সাথে ছাতুখোর উত্তরভারতীয়দের ধর্মীয় ইন্টারাকশন (নাকি ইন্টারকোর্স!) হলেও মূল্যবোধের মিলন তাই কখনো ঘটেনি। পারস্পারিক শ্রদ্ধার যে নিদর্শন রাজনৈতিক ইতিহাসের ফাঁকগলে ঢুকে পড়েছে, তাকে সুখকর বলা চলে না। ১৯৪৭ এর ভাগাভাগির দুই সপ্তাহের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে অগ্রসর জনগোষ্ঠির ভাষাকে দৈনন্দিন জীবন থেকে সরিয়ে ফেলার প্রচেষ্টা প্রজ্ঞার পরিচায়ক নয় তা যেমন সত্যি তেমনি সত্যি বাঙালির প্রতি, বাংলাভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের ভয়ংকর অভাব। একই কথা প্রযোজ্য বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ১৩ জুলাই ১৯৪৮ বাঙালি পুলিশের আন্দোলনের সহিংস ও রক্তাক্ত দমনে। যারা এ সমস্ত ক্ষমাহীন অপরাধের শাসনতান্ত্রিক কারণ হাজির করার কথা ভাবছেন, লক্ষ্য করি-
“Those of us (Pakistani) who grew up in the 1950s and 1960s knew in our hearts that East and West Pakistan were one country but notone nation. Young people today cannot imagine the rampant anti-Bengali racism among West Pakistanis then. With great shame,I must admit that, as a thoughtless young boy, I, too, felt embarrassed about small and dark people being among my compatriots.Victims of a delusion, we thought that good Muslims and Pakistanis were tall, fair and spoke chaste Urdu. Some schoolmates would laugh at the strange sounding Bengali news broadcasts from Radio Pakistan.” 
Shahbag Square-why we Pakistanis don’t know and don’t care, by Pervez Hoodbhoy
বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ তথা পশ্চিম বঙ্গ ও পশ্চিম পাকিস্তান-এ দুই পশ্চিমের বিরুদ্ধ স্রোতে বাঙালির বেদনার আরও কিছু বাকি। বলা যায়, এই অংশ শুধু যে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাই নয় বরং বাঙালির দুরবস্থা ও অপমানকে ভাষা দিয়েছে। শক্তিতো বটেই। একই সাথে বলে রাখা ভালো যে, এর অন্তত একটা অংশ বাংলাদেশে অপশক্তিতে পরিণত হয়েছে এবং বাংলার ঐতিহ্য, অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, প্রজ্ঞা ও  সম্মান বিনষ্ট করে চলেছে। প্রথমত, যারা মুসলিম বাংলার প্রতিনিধিত্ব করতেন, বাংলায় মুসলিম লীগের রাজনীতিকে আকার দিয়েছেন, পাকিস্তান আন্দোলনকে সফল করেছেন-পাকিস্তান অর্জনের সাথে সাথে তাদের পরিত্যাগ করা। পূর্ববাংলার রাজনীতির খোঁজ রাখেন যারা, জানেন যে পূর্ব বাংলায় ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনের পর উত্তর ভারতীয় ছাতুখোরেরা ঝরে যায় এবং কৃষক প্রজা সমিতির(পরে পার্টি) শেরে বাংলা ফজলুল হকের পর বেঙ্গল মুসলিম লীগের হাশিম-সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের নেতারাই সত্যিকারের সামর্থ রাখতেন। এর বাইরে নাজিমুদ্দিন-মোহনদের গ্রুপটি পুরোপুরিই জিন্নাহর তল্পিবাহক ও হাশিম-সোহরাওয়ার্দী গ্রুপকে চাপে রাখার হাতিয়ার মাত্র ছিল। পাকিস্তান অর্জনের সাথে সাথে নাজিমুদ্দিন গ্রুপকে মাথায় তুলে সোহরাওয়ার্দী গ্রুপকে পাকিস্তানে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি ও ফজলুল হকসহ অন্যান্য স্থানীয় জনপ্রিয় নেতৃবৃন্দকে কোণঠাসা করার নীতি গ্রহণ করে। উর্দুভাষী স্ট্যাবলিশমেন্ট এ আচরণ না করলে বাঙালি জাতীয়বাদের রাজনীতির পালে এতখানি বাতাস জমা হতো না। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সোহরাওয়ার্দী ও গভর্নর ফজলুল হকের কার্যকলাপই তার প্রমাণ। কাজেই পশ্চিমাদের ভ্রান্ত ও অগ্রহণযোগ্য নীতির ফলে এসকল জনপ্রিয় নেতা ১৯৪৯ সাল নাগাদ মুসলিম লীগের বিপরীতে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করে মুসলিম জাতীয়তাবাদের জ্বালানীটাকে কাজে লাগানোটাই স্বাভাবিক ছিল। বিশেষত যখন, সুযোগের রাষ্ট্রনেতারা পাকিস্তানের যাত্রা শুরু করেছেন বাংলায়, বাংলার জনপ্রিয় নেতাদের কোনঠাসা করে, বাংলাভাষা মুছে ফেলে, বাঙালি পুলিশ খুন করে, বাঙালিকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানিয়ে। বাংলায় ১৯৪৬ এর নোয়াখালি মার্কা সাম্প্রদায়িকতার চর্চা করার চেষ্টা করেছেন ১৯৫০ এ হিন্দু-মুসলিম, ১৯৫৪ সালে বাঙালি-অবাঙালি দাঙায়। যেসব কার্যকলাপ ও দাঙ্গা প্রায় ১০০ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গীয় ও পশ্চিম পাকিস্তানি অভিজাতদের (ব্রাহ্মণ ও মোল্লা) অবিশ্রাম পূর্ববাংলার মানুষকে অবাঙালি, অমুসলমান, অস্পৃশ্যতা প্রতিপন্নের প্রচেষ্ঠাকে নস্যাৎ করে নিজস্ব পরিচয় বিনির্মানের পথে ঠেলে দিয়েছে। প্রক্রিয়াটিকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় যে, ১৯৪৭ পর্যন্ত পূর্ব বাংলাবাসীকে বাঙাল, মুসলমান গণ্য করা হয়েছে, তারা নিজেকে অস্পৃশ্য মুসলমান ভাবতে বাধ্য হয়েছে। ১৯৪৭ এরপর আবার যখন তাদের নিম্নস্তরের মুসলমান/অমুসলমান গণ্যের চেষ্টা শুরু হয়েছে। তখন বাঙাল নিজেকে ‘বাঙালী মুসলমান’ প্রত্যয় সংগঠন ও বিনির্মানে সচেষ্ঠ হয়েছে। যার পূর্ণতা ঘটেছে ১৯৭১এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে।
০৫
“বাংলাদেশের স্বাধীনতায় পাকিস্তানও ভাঙ্গে নাই। দ্বিজাতি তত্ত্বও মিথ্যা হয় নাই। এক পাকিস্তানের জাগায় লাহোর প্রস্তাব মত দুই পাকিস্তান হইয়াছে। ভারত সরকার লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়নে আমাদের সাহায্য করিয়াছেন। তারা আমাদের কৃতজ্ঞতার পাত্র। দুই রাষ্ট্রের নামই পাকিস্তান হয় নাই। তাতেও বিভ্রন্তির কারণ নাই। লাহোর প্রস্তাবে পাকিস্তান শব্দটার উল্লেখ নাই। শুধু মুসলিম মেজরিটির উল্লেখ আছে। তার মানে রাষ্ট্রের নাম পরে জনগণের দ্বারাই নির্বাচিত হওয়ার কথা। পশ্চিমা জনগণ তাদের রাষ্ট্রের নাম রাখিয়াছে পাকিস্তান। আমরা পূরবীরা রাখিয়াছে বাংলাদেশ। এতে বিভ্রান্তির কোনও কারণ নাই ।”
-আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, আবুল মনসুর আহমদ, পৃ:৬৩৪
অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক বলছেন, তখন সময় অন্যরকম ছিল। সময়টা প্রতিফলিত ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন কমরেড মোজাফফর আহমদের ভাষ্যে, “... ষোল-সতের বছরের ছেলেরাও আন্দোলনে (বঙ্গভঙ্গের পক্ষে-বিপক্ষে) যোগ দিয়েছিলেন”। তা এখনও দেয়। সতের বছরের ছেলেরা হায়ার সেকেন্ডারির চৌকাঠে পা দিয়েই ছাত্র ইউনিয়ন/লীগ/দল/সমাজের পাণ্ডা হয়ে যায়। আর ছাত্র শিবিরের হাতেখড়ি তো হাইস্কুলের বারান্দায় উঠলেই। তাই, ১৯১১ সালে ১৩ বছর বয়সী তার প্রজাসভায় উপস্থিতি একটু অস্বাভাবিক দেখালেও ১৯১৪ সালে ১৬ বছর বয়স্ক মনসুর আহমদের কৃষক প্রজা সম্মেলনীতে উপস্থিতি খুব অস্বাভাবিক ছিল না। ইতোমধ্যেই  বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫), ময়মনসিংহের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নবাব সলিমুল্লাহ কর্তৃক মুসলিম লীগ গঠন (১৯০৬), স্বদেশি আন্দোলনের জেরে তার নিজ এলাকা ময়মনসিংহে দাঙ্গা (১৯০৭). মলি-মিন্টো আইনে সাম্প্রদায়িক নির্বাচন ব্যবস্থা সৃষ্টি (১৯০৯), আন্তর্জাতিক খেলাফত আন্দোলন শুরু (১৯১১), বঙ্গভঙ্গ রদ, রাজধানী কোলকাতা থেকে দিল্লীতে স্থানান্তর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা (১৯১২), ১৯১৪ সালে প-িত মদন মোহন মালব্যের নেতৃত্বে মুসলিমদের কাউন্টার ও ধর্মান্তর করার লক্ষ্যে হিন্দুমহাসভা গঠন প্রভৃতির ডামাডোলে বাঙালি মুসলমান আড়মোড়া ভেঙ্গে রাজনৈতিক ডাকে সাড়া দিতে শুরু করেছে। এ সাড়া যে কেবল ১৯০৬-০৭ বঙ্গভঙ্গজনিত দাঙ্গার ভূমিকা তাই নয় বরং লালনের ‘বাকীর লোভে নগদ পাওনা কে ছাড়িছে এ ভুবনে’র দর্শন, মর্লি-মিন্টোর আইনে মুসলমানদের পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থার নগদ ও আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতির ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর ধারাবাহিকতায় সাড়া পূর্ববাংলায় অনেক প্রজাসমিতি গঠিত হয়। বলা বাহুল্য, বঙ্গভঙ্গের ফলে প্রকৃতপক্ষে বাংলায় কংগ্রেস এর রাজনীতি শেষ হয়ে যায় (গান্ধি ও চিত্তরঞ্জনের পৌরহিত্যে সাময়িক পুনর্জীবন বিবেচনায় নিয়েও)। আর মুসলিম লীগের চেয়েও শক্তিশালী রাজনীতি ছিল প্রজাসমিতি, কৃষক সমিতির। এর কারণটা শেরে বাংলা বলেছেন, 
“বাংলার অর্থনীতি মানে বাংলার রাজনীতি।” 
বাকিটা স্বয়ং মনসুর আহমদের জবানীতেই পরিস্কার “...পরিস্থিতিটা এমন হৃদয় বিদারক যে, কংগ্রেসের নিষ্ঠাবান কর্মী হইয়াও আমি কংগ্রেস সহকর্মীদের সামনে জনসভায় কঠোর ভাষায় এই শতকের কথা বলিয়া হিন্দু বন্ধুদের বিরক্তি ভাজন হইতাম। আমি বলিতাম বাংলার জমিদার হিন্দু, প্রজা মুসলমান, বাংলার মহাজন হিন্দু, খাতক মুসলমান, উকিল হিন্দু, মক্কেল মুসলমান, ডাক্তার হিন্দু, রোগি মুসলমান, হাকিম হিন্দু, আসামি মুসলমান, খেলোয়াড় হিন্দু, দর্শক মুসলমান, জেলার হিন্দু, কয়েদি মুসলমান...”
আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃষ্ঠা-১২৫
ঘটনার ঘনঘটায়, স্বাভাবিক ও প্রাজ্ঞ বুদ্ধিতেই তিনি কৃষক প্রজা আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করেন। কংগ্রেস ও মুসলীমলীগের সাথে যুগপৎ সর্ম্পকও তার ছিল। তখনকার দিনে সেটাই ছিল রেওয়াজ। হিন্দু মহাসভা, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ, স্বরাজ পার্টি প্রভৃতির নেতাকর্মীরা যেমন কংগ্রেসের সাথে এসোসিয়েশন রাখতেন তেমনি খেলাফত পার্টি, কৃষক-প্রজাপার্টি, ইন্ডেপেন্ডেন্ট মুসলিম লীগ এমনকি কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কর্মীরাও কংগ্রেস, মুসলিম লীগের সাথে সংশ্লিষ্টতা রেখেই আলাদা পার্টি করতেন। ১৯৩৭ সালে কৃষকপ্রজা পার্টির সভাপতি থাকা অবস্থায়ই শেরে বাংলা একে ফজলুল হককে মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারি বোর্ডে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। এরকম সংশ্লেষ মনসুর আহমদেরও ছিল। আর ১৯১৬ সালে কংগ্রেস-মুসলিম লীগের ‘কনভেনিয়েন্ট ম্যারিজ’ লক্ষ্ণৌ’ চুক্তি এবং ১৯১৭ সালে খেলাফত আন্দোলনের শুরু থেকে ১৯২৩ সালে খেলাফত আন্দোলনের শেষ পর্যন্ত যে যেই পার্টিই করুক আন্দোলনের অভিমুখ, পারস্পারিক ঐক্য ও সংশ্লেষ সর্বোচ্চ পর্যায়ের ছিল। এ পর্যায়ে রাজনীতিতে আগমনকারীদের কাছে অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্ন ছিল না। ১৯২০ সালে আন্দোলনের তুঙ্গ অবস্থায় রাজনীতিতে যোগ দেয়া মনসুর আহমদ সর্ম্পকেও না। তবে তিনি মাওলানা আজাদ, ব্যারিস্টার আব্দুর রসুল, কাজী নজরুল ইসলাম, কমরেড মুজাফফর আহমদের মতো অসাম্প্রদায়িক কখনো ছিলেন না সে কথা হলফ করে বলা যায়। বরং তিনি ছিলেন, মাওলানা আকরম খাঁ, শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো কনভেনিয়েন্ট অসাম্প্রদায়িক (এবং তাঁর বন্ধু আবুল কালাম শামসুদ্দিন ও মুজিবুর রহমানের মতো কনভেনিয়েন্ট পলিটেশিয়ান!)। আরও পরিস্কার করে বললে, তাঁর হাতেখড়ির প্রজাসভা নামে অসাম্প্রদায়িক হলেও আদতে মুসলমান সংরক্ষণ সভা। তার সক্রিয় রাজনীতি খেলাফত-অসহযোগের জ্বালানি মুসলিমদের খেলাফতি পাগলামিরই সংক্রমণ। ১৯২৩ সালের পর দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের সাথে তার যে সংশ্লেষ, তা সোহরাওয়ার্দী, ফজলুল হকের মতোই প্রয়োজনের এবং সংগত মুসলিম ফেনোমেনা।
জনাব মনসুর আহমদ স্যাটায়ারিস্ট হিসেবে অনবদ্য কিন্তু রাজনীতিবিদ হিসেবে তার সমন্ধে যে কথাটি বলা যায় তা হলো, তিনি একজন দ্বিধাগ্রস্ত দ্বিতীয় শ্রেণির রাজনীতিবিদ। যিনি ক্যারিশমাটিক প্রথম শ্রেণীর নেতাদের ছায়ায় চলতে পছন্দ করতেন। রাজনীতি হয়তো তার প্রথম পছন্দ ছিল কিন্তু সে জন্য তিনি সর্বস্ব বাজি রাখতে রাজি ছিলেন না। বরং একজন সুযোগের রাজনীতিবিদ হিসেবে ক্যারিয়ার গড়েছেন। সুযোগ সৃষ্টি ও চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মানসিকতার অভাব ছিল তার।
তাঁর রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ খেলাফত আন্দোলনে রুমি টুপি, পোড়ানোর দৃশ্য থেকে। সারা জীবন খিলাফত, প্রজা সমিতি, কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন। মেশার সুযোগ পেয়েছেন গান্ধী, জিন্নাহ, মওলানা ভ্রাতৃদ্বয়, সি.আর.দাশ, নেতাজী সুভাষ, শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক জীবন একটু মনযোগের সাথে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, এঁদের স্পিরিট, জীবনবোধ, রাজনীতির প্রতি সমর্পন, সুযোগ সৃষ্টির পারঙ্গমতা, চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মানসিকতা কোনটাই তিনি গ্রহণ করেন নি বা করতে পারেন নি। বরং এই সকল নেতা যে রাস্তা তৈরি করেছেন সে রাস্তায় যতটা সম্ভব কম আয়াসে পথ চলার চেষ্টা তিনি করেছেন। শুরু থেকেই খেয়াল করা যাক, বঙ্গভঙ্গের ধারাবাহিকতায় যে কয়টা শহরে দাঙ্গা হয়েছে তার মধ্যে ময়মনসিংহ একটি। বাংলার অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী এলাকা হিসেবে দেশীয় বিভিন্ন ঘটনার ডামাডোলের আওয়াজ তাঁর শহরেই তুলনামূলক বেশী ধ্বনিত হয়েছে। তাঁর সময়ে সপ্তম-অষ্টম শ্রেণীর পড়ুয়া অনেকেই স্কুল বাদ দিয়ে রাজনীতিকেই জীবন করেছিলেন কিন্তু তিনি ১৯২২ সালের পূর্বে ১৯১১ ও ১৯১৪ সালে নিজ গ্রামে, নিজ স্কুলে প্রজাসমিতি ভিন্ন কোন রাজনৈতিক ঘটনায় জড়ান নি এমনকি ১৯১৭ সালে খেলাফতি পাগলামোতে, ১৯১৯ সালে অসহযোগে দেশ মজে গেলেও, জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনায়ও তাঁর মজে যাওয়ার কোন লক্ষণ আমরা দেখিনা। ১৯২২ সাল থেকেই বাংলায় লাগাতার যে দাঙ্গা শুরু হয় তার স্পর্শকাতরতা রাজনীতিবিদ মনসুর সাহেবের চেহারায় আমরা প্রত্যক্ষ করি না। বরং খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের তুঙ্গাবস্থায় তিনি মাঠে নামেন। আমাদের বিশ্বাস সেটাও তিনি করেছেন বন্ধু সাংবাদিক কাম রাজনীতিবিদ কাম লেখক আবুল কালাম শামসুদ্দিনের ‘মুসলিম জগৎ’ পত্রিকায় কাজের সুবিধার্থে এবং পেশাগত কাজের সূত্রে যতটুকু সম্ভব রাজনীতি করার জন্য। এভাবেই তাঁর ছোলতান, মোহাম্মদী, দি মুসলমান ও খাদেম পত্রিকায় চাকুরী, আইনপড়া ও খেলাফত-মুসলিমলীগ-কংগ্রেস-প্রজাসমিতি সংশ্লেষ। তবে ১৯২৯ সাল নাগাদ তাঁকে আমরা অপেক্ষাকৃত সক্রিয় রাজনীতিবিদ হিসেবে পাই। যখন, ‘১৯২৮ সালের প্রজাস্বত্ব আইনের প্রশ্নে দল নির্বিশেষে সব হিন্দু মেম্বাররা জমিদার পক্ষে এবং দল  নির্বিশেষে সব মুসলিম মেম্বারা প্রজার পক্ষে ভোট দেয়। আইনসভা সম্পর্কিত সাম্প্রদায়িক ভাগে বিভক্ত হয়। পর বৎসর সুভাষ বাবুর নেতৃত্বে কৃষ্ণনগর কংগ্রেস সম্মেলনীতে দেশবন্ধুর বেঙ্গল প্যাকট বাতিল করা হয়। কি মুসলমানের স্বার্থের দিক দিয়া, কি প্রজার স্বার্থের দিক দিয়া, কোন দিক দিয়া কংগ্রেসের উপর নির্ভর করিয়া চলা আর সম্ভব থাকিল না। আমরা মুসলমান কংগ্রেসীরা মওলনা আকরম খাঁ সাহেবের নেতৃত্ব কংগ্রেস বর্জন করিয়া নিখিলবঙ্গ প্রজাসমিতি গঠন করি (১৯২৯)।’ 
(আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃষ্ঠা-৪৫)
এইখানে কথা আছে। কথা হলো, ১৯৪৬ এর আগে তিনি কখনোই সম্পূর্ণরুপে কংগ্রেস বাদ দেন নাই। যে বিবেচনায়ই হোক বসু ভ্রাতৃদ্বয় বাঙালী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন, অন্যান্য কংগ্রেসীদের মতো ভন্ড ও মুসলিম বিদ্বেষী ছিলেন না। মনসুর সাহেব ১৯৩০ এ ছোট বসু সুভাষের একনিষ্ঠ কর্মী ও ময়মনসিংহ জেলা কংগ্রেসের সহ-সভাপতি হন। পরেও তিনি কংগ্রেস সভাসমিতিতে অংশগ্রহণ করেছেন। কিন্তু তাঁর অধিকতর এ্যাফিলিয়েশন ছিল মুসলিম লীগ ও প্রজাপার্টির সাথে। যাই হোক, সাংবাদিকতা থেকে বিচ্ছিন্নতার অবসরে রাজনীতি ও সাহিত্যে অধিকতর সক্রিয়তা প্রতিফলিত হয় ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘আয়না’তে। কৃষক প্রজার ১৪ দফায়, সর্বোপরী ‘৩৫ সালে তার প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায়। ১৯৩৮ সালে মনসুর আহমদের রাজনৈতিক জীবনের তৃতীয় ইনিংস শুরু হয়। এ ইনিংসে তিনি আগে রাজনীতিবিদ তারপরে সাংবাদিক। দৌঁড়াদৌঁড়িও অনেক কমে এসেছে। খেলাফত গেছে, কংগ্রেস প্রায় গেছে। আছে মুসলিম লীগ আর প্রজাপার্টি। এই অবসরে দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘ফুড কনফারেন্স’ প্রকাশ। বলাবাহুল্য ‘আয়না’তে সামাজিক জীবন প্রতিফলিত হলেও ‘ফুড কনফারেন্স’ অনেকখানি রাজনীতি নিনাদিত। যাইহোক, ‘দৈনিক কৃষক’ পত্রিকাসূত্রে প্রজাপার্টিতে সংশ্লেষ বেশি হলেও ১৯৪৬ এ লীগ প্রার্থীরুপে প্রাদেশিক পরিষদে পুনঃপ্রবেশ। সেই সাথে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষ ইনিংসের প্রস্তুতি শুরু। একটু খেয়াল করি, জাতীয় জীবনে ক্রান্তিকাল চলে এসেছে আর ১৯৪৭ সালের জানুয়ারীতে সোহরাওয়ার্দীর ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’ যোগ দিয়ে মনসুর আহমদ রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। অনেক কারণের অন্যতম, তাঁর তৎকালীন নেতা সোহরাওয়ার্দীর মুসলিম লীগে ব্রাত্য হয়ে পড়া ও পাকিস্তানে প্রবেশে বাধা। ১৯৫০ সাল পর্যন্ত আমরা সুযোগের অভাবে রাজনীতিবিদ মনসুর সাহেবকে পাই না কিন্তু একজন বুদ্ধিজীবীর উত্থান সমগ্র আলো কেড়ে নেয়। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ১৯৫০ সালে তিনি পাকিস্তানে হিজরত করে আওয়ামী মুসলীম লীগের রেডিমেড অনুকূল হাওয়াতেই পাল তোলেন। আরও অনুকূল বিষয় হলো নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগে ক্যারিশমাটিক সোহরাওয়ার্দী, ভাসানিবাদে তিনিই অন্যতম সিনিয়র লিডার। অন্যেরা সোহরাওয়ার্দী, হাশিম, ভাসানির তরুণ চ্যালাচামুন্ডা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, যত না রাজনৈতিক অর্জন তার চেয়েও দলীয় সিনিয়রিটি, সাহিত্যিক প্রাজ্ঞতা ও পরিচিতি ও রেনেসাঁ সোসাইটির কর্মসূত্রে যে পরিচিতি তার ভেলায় ভেসেই ১৯৫৪ তে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও ১৯৫৬ তে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী হন। সেখান থেকে জেলে। আর জেল থেকে বেড়িয়ে রাজনীতি থেকে অবসর। এটা পরিস্কার যে ১৯২২-১৯৪৬ পর্যন্ত যেরকম অনায়াসে পার্ট টাইম এবং ১৯৫০-৫৭ অনুকূল রাজনীতি করেছেন, ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৭৯তে তার পরলোক গমন পর্যন্ত রাজনীতি আর তত অনায়াস ছিল না। তার ওপর শেখ মুজিব, খোন্দকার মোশতাক, তাজউদ্দিনরা এসে গেছেন, ছিলেন সিনিয়র ও ক্যারিশমাটিক ভাসানি। ক্ষমতায় ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ ব্রিটিশদের বদলে লৌহমানব আইয়ুব খান, যিনি পাকিস্তানের যাত্রা শুরু করেছেন বেঙ্গল পুলিশের উপর গুলি চালিয়ে।
আবুল মনসুর আহমদ কোন আন্দোলন শুরু বা প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন নি কিংবা শেষও করেন নি। ভারবাহী হওয়ার কথা থাকলেও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আন্দোলন হস্তান্তরও তিনি করেন নি। গায়েনের গানে ধূয়া তুলেছেন যতক্ষণ অনুকূল বোধ করেছেন। প্রতিকূলতার দর্শনমাত্রে তিনি খেলা ছেড়ে দিয়েছেন। বাংলার জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার যে রাজনীতি শুরু করেছিলেন শেরেবাংলা ফজলুল হক, তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ভাসানি, সোহরাওয়ার্দী। মনসুর আহমদ একজন সিনিয়র পলিটেশিয়ান হিসেবে তাকে লক্ষ্যে পৌঁছে না দিয়ে হাল ছেড়ে দেন ১৯৬২ সালে। আরও লক্ষ্য করবার বিষয় হলো যখন তার একনেতা (শেরেবাংলা) মৃত্যুবরণ করলেন, আরেকজন (সোহরাওয়ার্দী) মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছেন। শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দীর উত্তরসূরী হওয়ার সুযোগ ও সম্ভাবনা থাকলেও তিনি তা নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। আমাদের সৌভাগ্য শেখ মুজিবের মতো তরুণ সেদিন হাল ধরেছিলেন, তাই বাংলাদেশের তরী ঘাটে ভিড়েছে। কিন্তু তিনি মাওলানা ভাসানির মতো রাজনৈতিক সাপোর্ট দিতেও ব্যর্থ হয়েছেন। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁকে পাস মার্কস দেয়া যায় কিন্তু ডিস্টিঙ্কশন নয়। অনেককেই বলতে শুনি, শেরেবাংলার সাথে তাঁকে তুলনা করতে দেখি। কিন্তু শেরেবাংলা যেমন চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন সারা জীবন এবং জিতেছেন তেমন চ্যালেঞ্জ গ্রহণের ইচ্ছাশক্তি মনসুর আহমদের দেখি না। শেরেবাংলা কংগ্রেস করেছেন- শীর্ষস্থান অধিকার করেছেন, মুসলিম লীগ করেছেন-বাংলার যথার্থ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেই, প্রজাপার্টি করেছেন- মুসলিম লীগ, জিন্নাহর ক্ষমতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েই, পাকিস্তানেও ফিরেছেন- শেরেবাংলার মতোই। যেখানে ১৯২২ সাল থেকে রাজনীতি শুরু করা মনসুর আহমদকে জেলা সহ-সভাপতির পদটি পেতে ১৯৩৫ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। জেলা সভাপতির পদে বরিত হন ১৯৫০ সালে। যখন তার দলে কোন সিনিয়র নেতা নেই। প্রজাপার্টি, মুসলিম লীগ, কৃষক-শ্রমিক পার্টি ছিল শেরেবাংলার অস্ত্র আর আওয়ামী লীগ মনসুর আহমদের আশ্রয়। অন্যদিকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অর্ধেক যাকে দিয়েছেন- প্রজা সমিতি কাম কৃষক প্রজাপার্টি-তা তাঁর পালিতা কন্যার মতোই, যত্নে গড়েছেন অন্যের জন্য! জনসেবায় তাঁর সফলতা তাঁর সৃষ্ট ইয়াকুব’র সাথেই তুলনীয়। তবু ইয়াকুব লর্ড হয়েছিল, তিনি হন নাই।
একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে ক্যারিয়ারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাঙালী-মুসলমান-ভারতীয়’র যে দোলন, তা আমরা তার চরিত্রে প্রত্যক্ষ করি। স্বতন্ত্র রাষ্ট্ররূপে পাকিস্তানের প্রবক্তারূপে, বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের স্বতন্ত্র সংস্কৃতির রূপরেখা নির্ধারণে, আবুল মনসুর ছিলেন একজন বিশেষ ব্যক্তিত্ব। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগেই পাক বাংলার কালচার তাঁর চিন্তা চেতনাকে অধিকার করে রেখেছে। দোভাষী পুঁথির চৈতন্যকে ভিত্তি ভূমি করে পাকবাংলার সাহিত্য রচনার তত্তকে খাড়া করেন যাঁরা, আবুল মনসুর  তাদেরই একজন। কিন্তু স্বাধিকার, স্বায়ত্ব শাসন ও স্বাধীনতার আন্দোলনে ও সশস্ত্র সংগ্রামে তিনি তাঁর মেধা ও মনন প্রয়োগ করলেও নানারূপ শঙ্কা ও দ্বিধাগ্রস্থতা তাঁকে আচ্ছন্নই রেখেছিল। তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক সৃষ্টিকর্মে তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাহিত্য তাঁর মর্মে ছিল কিন্তু তাঁর সুযোগ নির্ভর সৃষ্টি- সাহিত্যে তাঁর মতি, ডেডিকেশন, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিষয়ে প্রশ্নের উদ্রেক করে। তাঁর লেখা লেখি শুরু হয় ১৯২২ সালে কিন্তু প্রথম গল্পগ্রন্থ ১৯৩৩ সালে, উপন্যাস ‘জীবনক্ষুধা’য় তিনি পুনরায় সময়ের সুযোগে যে চিত্র চিত্রিত হয়, তা তাঁর ক্ষমতাকে প্রস্ফুট করে না। প্রবন্ধ লিখেছেন জীবনভর, সেই ১৯২২ থেকেই, পাকিস্তানকে পথ দেখিয়েছেন ১৯৪২ থেকে, বাঙালী জাতীয়বাদের পথ প্রদর্শক লেখা লিখেছেন ১৯৪৭ পর্যন্ত কিন্তু তাঁর সেরা কাজটি পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ৭২ বছর, লিখতে হয়েছে রাজনীতি, সাংবাদিকতা থেকে পূর্ণ অবসর নিয়েই। গল্পে যার শক্তি প্রবাদপ্রতীম, প্রবন্ধে যার শক্তি প্রমাণিত-অভিমুখী হলে তিনি যে কি করতে পারতেন তা শুধু কল্পনা করা যেতে পারে। তাঁর রাজনৈতিক সংশ্লেষ চূড়ান্তভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তনকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু তাঁর বেড়ে ওঠার কাল তাঁকে ছেড়ে যায় নি কখনও। খেলাফতি-মুসলিম লীগার হিসেবে অভিজ্ঞতা, সাংবাদিক হিসেবে হিন্দুসভা, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের মুসলিম বিদ্বেষ, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, কোলকাতা কর্পোরেশনে, প্রাদেশিক পরিষদে মুসলিম রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতির যে রূপ তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, পাকিস্তান আন্দোলনের কর্মী হিসেবে যে বোধ, যে স্বপ্নের ঘোর তিনি তৈরি করেছিলেন ১৯৪২ সালে ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সমিতি’র সক্রিয় সদস্য হিসেবে তার ঘোর কখনও কাটেনি তাঁর। এমনকি মুসলিম লীগ বিরোধী দলের মন্ত্রী থাকা অবস্থায়, স্বাধীনতাযুদ্ধের পরেও না। প্রমাণ উপরে উল্লিখিত তাঁর রচনাংশ।
মুসলিম লীগ বা রেনেসাঁ সোসাইটির কর্মী আর আমজনতার কাছে পাকিস্তান যে মরিচিকা, প্রতিষ্ঠার পরই তার বাস্তব মরুময়তা রচিত হয় ক্ষমতাসীন গ্রুপের দ্বারা। কিন্তু স্বপ্নে খুব বেশি প্রলেপ পড়েনি আর প্রপাগাণ্ডার সাথে বুদ্ধিজীবীদের একটি বৃহৎ অংশের আত্মবিক্রি তো সর্বজন স্বীকৃত। চির অনুসরণকারী মনসুর আহমদ কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ বটেই বেঙ্গল মুসলিম লীগেরও কেউকেটা ছিলেন না। কাজেই তাঁর পাকিস্তান ছিল স্বপ্নের। যে স্বপ্নে হিন্দু ভারত, হিন্দু বাংলা হতে পৃথকতর পাকবাংলার সৌধ তিনি নিজে গড়েছিলেন। সে সৌধের গায়ে যখন উর্দুভাষী, সাম্প্রদায়িক শক্তির আঁচড় পড়ে তখন তিনি নিজের দিকে মুখ ফেরান, ১৯৪৭ এর সেপ্টেম্বরে ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ পুস্তিকায় বাংলার পক্ষে দাঁড়ান। আবার সেই তিনিই ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্র বিরোধী আইয়ুব খানকে সমর্থন করেন। বাংলার মানুষের অধিকারের স্বপ্নেই তার দীর্ঘ রাজনীতি, স্বাধীন দেশের গৌরবেও তিনি সমান গৌরবান্বিত কিন্তু সে গৌরবের পতাকা বইবার বদলে ‘রাজনৈতিক হরিঠাকুর বা হৈরাতাঁতী’ হতেই যেন তিনি আরাম বোধ করেন। যে পতাকা তাঁর নিজের বইবার কথা, সে পতাকা বইলো তাঁর রাজনৈতিক অনুজ। যাই হোক, হৈরাতাঁতী’র পরামর্শ নিয়েছে অনেকেই। কেউ মেনেছে, কেউ মানে নি। কিন্ত, অবশ্যমান্য একটি পরামর্শ স্মরণ করেই আলোচনা শেষ করবো-
বাংলা বিভক্ত হয়েছে। একসাথে থাকা অসম্ভব হয়েছে বলেই। বাংলা বিভক্ত হয়েছে। কারণ, বিভক্ত করাকেই সকলের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার একমাত্র পন্থা বিবেচিত হয়েছে। বাংলা বিভক্ত হয়েছে-কারণ আমরা একে অপরকে ঘৃণা করতাম, এখনও করি, ভবিষ্যতেও করবো। বাংলা বিভক্ত হয়েছে-কারণ একাংশের নিকট বাঙালী জাতীয়তাবাদের চেয়ে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ শ্রেয়তর মনে হয়েছে। বাংলা বিভক্ত হয়েছে-কারণ অনেকের নিকট বাংলার কোন ভবিষ্যত দৃষ্ট হয় নাই। আজ যখন পূর্ব বাংলা নিজেদের ভবিষ্যত গড়ে নিয়েছে-তখন এপাড় বাংলা ওপার বাংলা নামের মরে যাওয়া অতীতকে খুড়ে তোলা শুধু ন্যাকামি নয় গাধামি। ১৯৪৭ এর পর ওপাড় বাংলা বলে কোথাও কিছু নাই। এপাড়ে বাংলা, ওপাড়ে ভারত। এমনই কথা ছিল। এমনই হয়েছে। পড়ন্তু, ওপাড় বাংলার কথা বলে শুধু যে এক মৃত ঘোড়াকেই তারা জীবন দান করেন তাই নয়। বরং বৃহত্তর আসাম, দন্ডকারণ্যের জঙ্গলে, আন্দামানে, দিল্লী ও অন্যত্র মানবেতর জীবনযাপনকারী লাখো বাঙালিকে তারা রীতিমতো অস্বীকার ও অপমান করেন। এ পাপ শুধু বাংলার জন্যই নয়। দুনিয়ার লাখো বাঙালীর জন্য, বাংলাদেশের জন্য, ভারতের জন্য, দক্ষিণ এশিয়ার জন্য- কারো জন্যই ভালো নয়। হরিঠাকুরের মতে, এ ন্যাকামোকে কবর দেয়া জরুরী। কারণ,
“যুক্তবাংলা স্বাধীন স্বার্বভৌমই হউক, আর ভারত ইউনিয়নের অংগ রাজ্যই হউক, উভয়টাই সংঘাতের পথ। বাস্তবতার বিচারে ওটা অসম্ভব, ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রীর দিক হইতে অবাঞ্ছনীয়, উপমহাদেশের শান্তির পরিপন্থি। এ সব জানিয়াও যাঁরা একটা স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্র ও একটা অংগরাজ্যকে সমমর্যাদার স্তরে আনিয়া কথা বলেন, তাঁরা সাধারণভাবে উপমহাদেশের শান্তির বিরুদ্ধে ও বিশেষভাবে বাংলাদেশ-ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করেন”
(আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃষ্ঠা-৬৩৬)
তাঁরা কি বাংলাদেশের সম্মানের বিরুদ্ধেও কাজ করেন না?
রাজনীতিবিদ মনসুর আহমদ আমাদের হতাশ করেন, কিন্তু একজন হরিঠাকুরকে আমাদের সহস্র প্রণাম। যিনি সাতসকালে ঘুমভাঙ্গা বাঙালি মুসলমানের সামনে প্রজাসমিতির ঝাণ্ডাটাকে উচ্চে তুলে ধরেছেন, বাংলা থেকে জমিদারী উচ্ছেদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সামাজিক অসঙ্গতি-কুসংস্কারকে ঝাটাপেটার চেষ্টা করেছেন, সদ্য অর্জিত পাকিস্তানের হ্যালুসিনেশন কাটবার আগেই সদাজাগ্রত ষড়যন্ত্রীদের সমুখে বাংলার গানটাই গেয়েছেন। ঐতিহাসিক একুশ দফার প্রণেতা, যুক্তফ্রন্টের রূপকারকে সালাম। মারি চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারী, ছয়দফার আবুল মনসুর চিরজীবী হোক।
এক নজরে আবুল মনসুর আহমদ
(১)    ১৮৯৮ সালের  ৩ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানার ধানীখোলা গ্রামের ফরাজিবাড়ীতে জন্মগ্রহণ
(২)    ১৯১৪সালে রাজনীতিতে হাতে খড়ি, নিখিল বঙ্গ প্রজা সম্মিলনী, ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত (ময়মনসিংহ মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অস্থায়),
(৩)    ১৯১৭সালে ময়মনসিংহ মৃত্যুঞ্জয় হাই স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ
(৪)    ১৯১৯সালে ঢাকা জগন্নাথ কলেজ থেকে আই.এ
(৫)    ১৯২০ সালে ডিগ্রী ক্লাসের ছাত্র থাকা অবস্থায় প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে যোগদান, খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান,
(৬)    ১৯২১সালে ঢাকা কলেজ থেকে বি এ পাশ করেন।
(৭)    ১৯২২সনে রাজনৈতিক নেতারূপে আত্মপ্রকাশ । ময়মনসিংহ জেলা খেলাফত সমিতির সম্পাদক হিসেবে।
(৮)    আবুল কালাম শামসুদ্দিন সম্পাদিত‘মুসলিম জগৎ’ সাপ্তাহিক পত্রিকায় নিয়মিত লিখতে শুরু করেন।
(৯)    ১৯২৩ সালে মনিরুজ্জামান ইসলামবাদী সম্পাদিত ‘ছোলতান’ পত্রিকায় তিনি সহ-সম্পাদক হিসাবে কাজ শুরু করেন
(১০)    বেঙ্গল প্যাক্ট (এপ্রিল ১৯২৩) সমর্থক রূপে সিরাজগঞ্জ সম্মেলনের অন্যতম সংগঠক, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ দলের সমর্থক ও সংশ্লিষ্ট।
(১১)    ১৯২৪ সালে সিরাজগঞ্জে কংগ্রেসের প্রদেশিক সম্মেলনে মওলানা আকরাম খাঁর সঙ্গে পরিচয়, সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদী’তে যোগদান
(১২)    ১৯২৬ সালে ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকা থেকে ছাটাই এবং
(১৩)    ‘সত্যাগ্রহী’ পত্রিকার সম্পাদক মওলানা কাফী সুপারিশে মৌলবি মুজিবুর রহমান সম্পাদিত ‘দি মুসলমান’-এ চাকুরী হয়, পরবর্তীতে ‘খাদেম’ নামীয় একটি বাংলা পত্রিকার সম্পাদনা করেন।
(১৪)    ১৯২৭ সালে মুসলিম লীগে যোগদানএবং নিখিল ভারত মুসলিম লীগ সম্মেলন-এর  অভ্যর্থনা সমিতির সহকারী সম্পাদক নির্বাচিত হন।
(১৫)    ১৯২৯সালে ডিসেম্বরে পেশা বদল করেআইন পেশায় আত্মনিয়োগ।
(১৬)    ১৯৩০সালে আঞ্জুমান ইসলামিয়ার এবং ময়মনসিংহ জেলা কংগ্রেসের সহ-সভাপতি। এ সময় নেতাজী সুভাষ বসুর ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের প্রভাবে তিনি একনিষ্ঠ কংগ্রেস নেতা।
(১৭)    ১৯৩৩ সালে বিহারের রাচিতে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস সম্মেলনে যোগদান।
(১৮)    ১৯৩৫ সালে ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত ‘নিখিল বঙ্গপ্রজা সম্মেলনী’র-অভ্যর্থনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হন। এ সভায় শেরে বাংলা সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হন।
(১৯)    ১৯৩৫সালে গল্পগ্রন্থ আয়না প্রকাশিত।
(২০)    ১৯৩৫সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদের ‘কৃষক প্রজার চৌদ্দদফা’ মেনিফেস্টো রচনা ।
(২১)    ১৯৩৫ সালে ময়মনসিংহ জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি, প্রাদেশিক প্রচার সম্পাদক, প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন
(২২)    ১৯৩৮ সালের ডিসেম্বরে নিখিল বঙ্গ প্রজা পার্টির উদ্যোগে কৃষক প্রজা আন্দোলনের মুখপত্র ‘দৈনিক কৃষক’ পত্রিকা সম্পাদনার মাধ্যমে পুনরায় তিনি সাংবাদিকতায় ফিরে আসেন।
(২৩)    ১৯৪১ সালে আবুল মনসুর আহমদ,শেরে বাংলা এ,কে. ফজলুল হক এর‘দৈনিক নবযুগ’ পত্রিকায় বেনামী সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ বছরের ডিসেম্বরে ফজলুল হক মুসলিম লীগ ত্যাগ করে কৃষক প্রজা পার্টি পুনর্গঠন করে কংগ্রেস, হিন্দুমহাসভার সাথে প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন এবং মন্ত্রিসভা গঠন করেন।নবযুগ সম্পাদনার সুবাদেইতিনি কৃষক প্রজা পার্টির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
(২৪)    ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত হয় আরেক গল্পগ্রন্থ ‘ফুড কনফারেন্স’
(২৫)    ১৯৪৬সনে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রচার সম্পাদক ও লীগ প্রার্থীরূপে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
(২৬)    ১৯৪৭সালের জানুয়ারীতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’ পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সম্পাদনাসূত্রে ১৯৪৭-৫০ সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে অবস্থান। ১৯৫০এর গোড়ার দিকে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আবুল মনসুর আহমদের সক্রিয় সাংবাদিক জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।
(২৭)    ১৯৫০সালে ময়মনসিংহ এসে পুনরায় আইন ব্যবসা শুরু এবংমে মাসে আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগদান ও ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হন।
(২৮)    ১৯৫৩সালে আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত ক্রমে যুক্তফ্রন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ঐতিহাসিক মেনিফেস্টো ২১দফা রচনা।
(২৯)    ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক স্বাস্থ্যমন্ত্রী হন।
(৩০)    ১৯৫৬সালের ৬ সেপ্টেম্বর পূর্ববাংলায় আতাউর রহমান খানের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় শিক্ষামন্ত্রী এবং পরে ১২ সেপ্টেম্বর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় উপপ্রধানমন্ত্রী ও বাণিজ্য-শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতে ‘অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী’ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন 
(৩১)    ১৯৫৮অক্টোবরে কারাবরণ।
(৩২)    ১৯৬২ ফেব্রুয়ারীতে ফের কারাবরণ। একই বছর মুক্তিলাভ এবং রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ।
(৩৩)    ছয়দফার বাংলা ও ইংরেজি ব্যাখ্যা ‘আমাদের বাঁচার দাবী’ ও ‘আওয়ার রাইট টু লিভ’ রচনা।
(৩৪)    বাঙালির অধিকারের প্রশ্নে আপোষহীন মনোভাব পোষণ করেছেন। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে তিনি আবহমানকালের ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালী সংস্কৃতির বদলে পূর্ব-বাংলায় ধর্ম ভিত্তিক স্বতন্ত্র সংস্কৃতি সৃষ্টির প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এই সংস্কৃতি পাক বাংলার কালচার নামে আখ্যায়িত। রবীন্দ্র সংগীত পাকিস্তানের আদর্শের পরিপন্থি এই বক্তব্য উপস্থাপন করে ১৯৬৭ সালের জুন মাসে পাকিস্তান সরকার রেডিও টেলিভিশন থেকে তা প্রচার বন্ধের পদক্ষেপ  নিলে সে সিদ্ধান্তের প্রতি তিনি সমর্থন জ্ঞাপন করেন।
(৩৫)    ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ গ্রন্থে ব্রিটিশ শাসনাধীন বাংলা, পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বিধৃত করেছেন।
(৩৬)    ১৯৭৯ সালের ১৮ মার্চ আবুল মনসুর আহমদ-এর কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে।
তথ্যসূত্র: 
১."History of Bangladesh". Bangladesh Student Association. Archived from the original on 19 December 2006. Retrieved M06-10-26.
২.পূর্বোত্তরের বাংলা সাহিত্য এবং বিকল্প প্রতিষ্ঠানের খোঁজ, সুশান্ত কর,www.alasdupur.tk
৩.আমার দেশ আমার শতক, নিরোদ সি. চৌথুরী, পৃষ্ঠা-১৪,২৯ ও ৩১;
৪. Saga of Bengal Partition, Dr. Mohammad Abu Tayyub Khan, 2011;
৫.বাঙালী মুসলমানের মন, আহমেদ ছফা, পৃষ্ঠা-২৭;
৬.The Rise of Islam and the Bengal Frontier,1204-1760, Rechard M. Eaton, California University Press
৭.বাংলা ও বাঙালীর বিবর্তন, অতুল সূর, পৃষ্ঠা-১৯১-৯২, ২৮২, ৩২৪-২৫, ৩২৯;
৮. Cast and Social Stratifiction among the Muslims, ed. Imtiaz Ahmed
৯. বাংলার রেনেঁসা আর অন্তজ্য শূদ্র, কংকর সিংহ, পৃষ্ঠা-২৮;
১০.রামমোহন রচনাবলী, সম্পাদনা:প্রসাদ রঞ্জন রায়, ডিসেম্বর ২০০৮, পৃষ্ঠা-৭৫১;
১১. Colonialism, politics of language and partition of Bengal PART XXI, Nurul Kabir, The New Age, 21 September 2013;
১২. বাংলা সাহিত্যে যা আছে, সবই আমার, প্রাবন্ধিক আনিসুজ্জামানের সাক্ষাৎকার, প্রথম আলো, ৩ জানুয়ারী ২০১৪;
১৩. Muslims and English education in colonial Bengal: Calcutta Madrasa and Hooghly Mohsin College in historical perspective by Rajesh Kochhar (2011)
১৪. নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহর ৯৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ, নিউজইভেন্ট২৪.কম, ১৬ জানুয়ারী ২০১৪;
১৫. More on the Lukhnow Pact (1916), Mr. M. Rashiduzzaman, NFB Jinnah Debate, 19 November 1997
১৬. আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, কমরেড মুজাফফর আহমদ, পৃষ্ঠা-২৬, ২৭-২৮,২৯, ৩৫;
১৭. যদ্যপি আমার গুরু, আহমদ ছফা, পৃষ্ঠা-২৫, ৪৮, ৫০, ৫২;
১৮. Culture as a site of struggle, K.N. Panikkar, The Hindu, Jan 27, 2009 & Contemporary Hindu-Muslim Problem” by Sarat Chandra Chattopadhyay presented at the Bengal Provincial Conference of 1926,  Hindu Revolution, August 02, 2011;
১৯. Race Elements in Bengal, D. N. Majumdar and C.R. Rao, page-96
২০.বাংলাদেশ, প্রথম বিজয় দিবস বার্ষিকী উপলক্ষে স্মারক গ্রন্থ, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২, পৃষ্ঠা-৪৯-৫০, ৫৩।
২১. Shahbag Square — why we Pakistanis don’t know and don’t care, Pervez Hoodbhoy, The Express Tribune, 16 February, 2013;
২২.আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, আবুল মনসুর আহমদ;
২৩.Hindu-Muslim riots: A Survey, 




এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন

close