শিরোনাম :

প্রচ্ছদ » সাহিত্য

বুদ্ধদেব বসু ছিলেন সাহিত্যের সৎ সমালোচক : মজিদ মাহমুদ

রবি, ২০ মার্চ'২০১৬, ১:০১ অপরাহ্ন


বুদ্ধদেব বসু ছিলেন সাহিত্যের সৎ সমালোচক : মজিদ মাহমুদ  
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এক প্রবাদ পুরুষের নাম বুদ্ধদেব বসু। আজ তাঁর প্রয়াণ দিবস। এ দিনে তাঁকে নিয়ে লিখেছেন মজিদ মাহমুদ।
আধুনিক বাংলা কবিতা বিচারে পঞ্চ-পাণ্ডব প্রকল্পের অন্যতম ভ্রাতা বিবেচনায় এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়- বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) ছিলেন মধ্যম-ভ্রাতা অর্জুন। অবশ্য তিনি নিজে মহাভারতের সাহিত্যিক মূল্য নির্ধারণ করতে গিয়ে বলেছেন- এই মহাকাব্যের নায়ক অর্জুন নন- স্থিতধী যুধিষ্ঠির। আর বয়স ও কর্মের নিস্পৃহতা বিবেচনা করে যুধিষ্ঠিরের আসনটি আমরা জীবনানন্দ দাশের (১৮৯৯-১৯৫৪) জন্য রেখে দিতে পারি। যদিও শ্রীমাণ বসু’র এ মতকে যুক্তিনিষ্ঠভাবে খণ্ডন করেছেন স্বয়ং কবিপত্মী প্রতিভাবসু। তিনি যুধিষ্ঠিরকে এ কাব্যের নায়ক বলতে নারাজ। তবে জ্যেষ্ঠভ্রাতা জীবন জগতের প্রতি যতই নির্মোহ হোক না কেন তার কর্মের গভীরতা বিবেচনা করে বুদ্ধদেব বসু প্রথমেই জীবনানন্দ দাশ মহাশয়কে একটি আসন নির্মাণ করে দিয়েছিলেন- যার গুরুত্ব সাহিত্যের পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে সবারই জানা আছে। সে বিতর্ক যা-ই হোক, সাহিত্যের রণক্ষেত্রে- বিশেষ করে তিরিশের খাণ্ডবযুদ্ধে বুদ্ধদেব বসু-ই ছিলেন গাণ্ডিবধারী বর্ণাঢ্য পার্থ। তাঁর গদ্য-পদ্যের দু’হাতই ছিল সমান পারদর্শী। ভাবের গভীরতা, বিষয়-বৈচিত্র্য ও সংখ্যাধিক্য বিবেচনায় কেবল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর সহজ তুলনা চলে।
কবি হিসেবে একটি সহজ পরিচিতি তাঁর নামের সাথে মানানসই হলেও রবীন্দ্র-নজরুল-উত্তর বাংলা কবিতাকে তিনি একটি নিজস্ব ভূমির ওপর দাঁড় করানোর জন্য আপ্রাণ কাজ করেছিলেন। কেবল সময়ের প্রয়োজনে কবিতার পরিবর্তিত দুর্গম পথে যাত্রার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে রাখেননি; কেন এই নির্জন পথে তাঁর এবং তাঁর সহযাত্রীদের অভিযাত্রা তারও ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। কখনো বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। ‘কবিতার শত্রু ও মিত্র’দের নিয়ে বই লিখেছেন। কবিতা না বোঝার জন্য পাঠকের মূঢ়তা ও জাড্য মানসিকতার নিন্দা করেছেন। তাঁর এই ক্ষুদ্ধতার, তাঁর এই অভিযোগ প্রবণতার যুক্তিসংগত কারণ ছিল। তিনি বলতে চেয়েছেন, কবিতার শত্রু কেবল তার সময়ে সক্রিয় নন; সবকালেই ছিলেন। প্লেটো থেকে শুরু করে রুশো, এমনকি তলস্তয় পর্যন্ত কবিকে ভালো চোখে দেখেন নি। কিন্তু তাতে কবির কি? রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সঙ্গে কবির না-ই মিলতে পারে। কবিরা কবিতা লেখা বন্ধ করলে, এমন কোন্ ভালোটা ঘটবে- যার ফলে মাঠে ফসলের ফলন বেড়ে যাবে। এমন অনেক শিল্প আছে, যা নিয়ে সবাই নাক গলায় না। কিন্তু কবিতা নিয়ে সবাই কেন নাক গলায়- এ সব প্রশ্নের তিনি মীমাংসা করতে চেয়েছেন। আসলে কবিতা এমন এক শিল্প- যা মানুষের আদিম প্রবৃত্তি ও অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত; মানুষ যা হারিয়েছিল কবিতার মাধ্যমে তার স্মৃতি ফিরে পেতে চায়। যে কারণে কবিতা নিয়ে কথা বলার অধিকার সবাই রাখে। কবিকে তাদের কণ্ঠস্বর হিসেবে মনে করতে চায়। কিন্তু তার নিজের হারানো বস্তুর সঙ্গে যখন মেলাতে পারেন না, তখন কবিতার প্রতি কবির প্রতি অভিযোগ ছুঁড়ে দেন। আর সে অধিকার হয়তো সবার সহজাত। তা নিয়ে ক্ষুব্ধ হওয়া চলে না।
বুদ্ধদেব বসু এমন এক সময়ে সাহিত্য রচনায় ব্রতী হয়েছিলেন, তখন সত্যিই নিজের সাহিত্য করা সহজ ছিল না। তখন পরাক্রান্ত রবির কর পশ্চিমপ্রান্তে হেলে পড়লেও তখনও ছিল তা সর্বাধিক আলোকমণ্ডিত। আর বিক্ষুদ্ধ ব্রাত্যাহত নজরুলের ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে নোঙর করার উপায় ছিল না। রবীন্দ্রনাথের এবং কিছুটা নজরুলের সাহিত্যিক কণ্ঠের বাইরে নিজেদের স্বরোত্তোলন করা এক ধরনের চিন্তা বিলাস বা বাতুলতা ভিন্ন নয়। কিন্তু এই দুই মহারথীর সাহিত্যিক পথে হাঁটা যেমন সহজ ছিল না তেমন সময়ের প্রয়োজনীয়তাও ক্ষীণ হয়ে আসছিল। কারণ যাদের হাত ধরে তিরিশের কবিতার যাত্রা, তারা ছিলেন ইংরেজ শাসন সুবাদে এ দেশের মজ্জায় গেঁথে দেওয়া ভাষা ও চেতনার পরিপূর্ণ প্রতিষ্ঠার মধ্যে বেড়ে ওঠা প্রতিভাবান প্রজন্ম। রবীন্দ্র-নজরুল কবি জীবনের সঙ্গে কোনোভাবে তাঁদের মেলে না। ‘কবি’ নিয়ে মাইকেল থেকে নজরুল পর্যন্ত যে ধরনের মিথের জন্ম হয়েছিল; বাঙালির কবি বিলাস যে ধরনের প্রবণতাসমূহকে কবি বলে ঠাহর করেছিল। তিরিশের কবিরা সত্যি সত্যি সেই কবি-মিথকে আঘাত করেছিলেন। এ যুগের কবিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, বিশেষ করে ইংরেজের ভাষা রীতিমত রপ্ত করে- বাংলা ভাষা সাহিত্যের সেবা করতে নামলেন। কিন্তু এ কথা বলা যায়, উপনিবেশের অবদানে তিরিশের কবিদের ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে যে ধরনের আত্মীয়তা তৈরি হয়েছিল- কবিতা পাঠকের ক্ষেত্রে হুট করে সে সম্পর্ক স্থাপন সম্ভব ছিল না। ফলে বাংলা কবিতার চিরন্তন পাঠক কিছুটা কবিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন; কিছুটা অহেতুক অক্ষমের অভিযোগ করলেন। এ ক্ষেত্রে এতটা ভূমিকার কারণ এই যে, বুদ্ধদেব বসু কবি ও পাঠকের অপরিচয়ের এই পর্বে একটি সেতুবদ্ধ হিসেবে কাজ করেছিলেন- তাঁর সুপ্রচুর গদ্য রচনা দ্বারা। এখানেই বুদ্ধদেব বসু সমকালের অন্য কবিকর্মীদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তার মানে এই নয় বুদ্ধদেব বসু ছাড়া তিরিশের প্রধান কবিদের কেউ গদ্য রচনা করেন নি। বরং কবিতার মতো তাদের গদ্যও ছিল একটি নতুন ধরনের সাহিত্য সৃষ্টি। কিন্তু তা ছিল একই মাত্রায় পাঠকের কাছে প্রশ্নবোধক। বুদ্ধদেব বসু কবিতার পাশাপাশি অসংখ্য গদ্য রচনায় এ ধরনের জট খুলতে সচেষ্ট ছিলেন। পাঠকের কাছে পরিচয় করে দিয়েছিলেন, তাঁর নিজের কবিতাকে, সমকালীন বাঙলা কবিতাকে এমনকি বিশ্বের অন্যভাষার কবিতার সঙ্গেও বাঙালি পাঠকের সংযোগ ঘটিয়েছিলেন তিনি। যে কাজটি এত ব্যাপকভাবে আর কেউ করেননি।
কবি হয়ে ওঠার সূচনাপর্বে বুদ্ধদেব বসু হয়তো একটি প্রকৃতিদত্ত কারণের মুখোমুখী হয়েছিলেন। তাঁর আজন্ম নিসংগতা তাঁকে চিন্তা ও কল্পনার জগতে পথ খুলে দিয়েছিল। ফলে ‘বাথরুম’ নিয়েও তাকে শব্দ গেঁথে তুলতে বেগ পেতে হয় না। জন্মের মূহূর্তেই মা-কে হারিয়েছিলেন; পিতার ভালোবাসা তাঁর জন্য অবিরত ও অবিমিশ্র ছিল না। কবির কৈশোরে আইনজীবী পিতা ভূদেব বসু ঘর ছেড়ে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করেন। প্রতিভাবান এই বালক মাতাপিতার অনুপস্থিতিকে কল্পনার সুতা দিয়ে গেঁথে তুলেছিলেন। কবি হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে বুদ্ধদেব বসু জন্য যেমন ছিল একটি সহজাত ও স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাপার তেমনি দেশি-বিদেশি সাহিত্যের ব্যাপক পঠন-পাঠন দ্বারা তিনি নিজের সৃষ্টিকর্মকে সমৃদ্ধ করে তুলেছিলেন। কবির এই শতবর্ষ পূর্তিতে তাঁর প্রতি এই শ্রদ্ধার্ঘ্য ও দ্রুত লিখিত রচনায় আমি তাঁর প্রবন্ধের প্রতি মনোযোগী হতে চাই। কারণ বুদ্ধদেব বসুর কবিতা শৈলির পার্থক্য সমকালীন কবিদের থেকে আলাদা করা গেলেও পঞ্চনদের নিজস্ব ভূখণ্ডে প্রবাহিত হওয়ার অধিক নয়। আর বাংলা কবিতার যে আলাদা হবার আন্দোলন তাঁরা সবাই মিলে শুরু করেছিলেন; তা কেবল ছিল তাঁর সমকালীন আন্দোলন। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না- এর সবটাই আজ ইতিহাসের বিষয়। কবি ও পাঠকের রুচি বাচনভঙ্গি যেভাবে বদলে গেছে তাকে আর আগের জায়গায় রেখে দেয়া যায় না। এমনকি বুদ্ধদেব বসুর লিখিত উপন্যাসগুলোও পাঠককে আর একই মাত্রায় আনন্দ দেয় না। এমনকি এ কালের পাঠকরা ভুলতে বসেছে- বুদ্ধদেব বসু সত্যিই কোনো উপন্যাস লিখেছিলেন কিনা? বুদ্ধদেব ঔপন্যাসিক- সে সত্য আজ তিরোহিত; বুদ্ধদেব বসু কবি- সে কেবল স্মৃতি। এমনকি কবিতার সম্পাদক হিসেবে তিনি সাহিত্য-জাতির যে মহান দায়িত্ব পালন করেছিলেন তাও আজ ইতিহাস। তবে বুদ্ধদেব বসু প্রাবন্ধিক সে সত্য উপস্থিত। আমার মনে হয় তিরিশের প্রেক্ষাপটে বুদ্ধদেব বসু যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন, আজও সেই একই কারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই গুরুত্বের প্রধান ও একমাত্র কারণ তাঁর সৃষ্টিশীল ও মননশীল প্রবন্ধসমূহ। আর এ কথা সত্য- তাঁর সমকালে আর কেউ-ই বাংলা প্রবন্ধে তাঁর মতো উৎকর্ষ ব্যাপকতা স্পর্শ করতে পেরেছিলেন কিনা তা তর্ক সাপেক্ষ।
কেন বুদ্ধদেবের প্রবন্ধ গুরুত্বপূর্ণ? এর একটি সহজ জবাব, বুদ্ধদেবের প্রবন্ধের মাধ্যমে তার সমকালীন সাহিত্যে আমাদের প্রবেশ করতে হয়। তা ছাড়া কবিতা ও সাহিত্য নিয়ে প্রবন্ধের দ্বারা পাঠকের ওপর একটি প্রভাববলয় তৈরি- তার আগে রবীন্দ্রনাথ ভিন্ন এতখানি কেউ করেননি। রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী ও মোহিতলালের পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের বিশেষ করে বাংলা কবিতার ব্যাখ্যাকার হিসেবে তিনি নিজেকে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। তিনি প্রবন্ধের বিষয় ও শৈলি পূর্বসূরীদের থেকে পৃথক করতে পেরেছিলেন। এমনকি প্রবন্ধের প্রথম গ্রন্থ থেকেই তিনি যে আলাদা সে কথা প্রমথ চৌধুরীও স্বীকার করেছিলেন। বলেছিলেন, তার প্রবন্ধ প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ধরনের বাইরে এসে একটা নিজস্ব ঢং তৈরি করেছে। তাঁর প্রবন্ধই বাংলা সাহিত্যে প্রথম ব্যক্তিগত প্রবন্ধ। সাহিত্যের ভালো ও মন্দ লাগাকে নিজের অনুভূতির জারকে মিশে প্রকাশ করা। তাঁর প্রবন্ধের মধ্যে তাঁর কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়া যায়।
বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধ নিয়ে আলোচনার আগে দুএকটি প্রয়োজনীয় কথা সেরে নিতে চাই। কেন প্রবন্ধ শ্রেষ্ঠ? কারণ প্রবন্ধের মাধ্যমেই লুপ্ত ও গুপ্তকে তুলে ধরা যায়। এ ক্ষমতা যাদের নেই, তাদের পক্ষে এই দায়িত্বটি পালন করা সম্ভব নয়। তাছাড়া বুদ্ধদেব বসুর সাহিত্যাকাশ এতটাই সম্প্রসারিত যার মধ্যে পরষ্পর বিরোধী উপাদানের সহজ বসবাস সম্ভব। সাহিত্যকে তিনি খণ্ডিত প্রেক্ষাপটের মধ্যে বিবেচনা করেন নি। যে প্রবণতা মূলত তিরিশের কাল থেকে শুরু হয়েছিল। আর তাঁর এ ধরনের মানসিক প্রবণতা তাঁকে সমকালীন বাংলা সাহিত্যের মাতৃত্ব ও ধাতৃত্ব পদে অধিষ্ঠিত করেছিল। প্রগতি ও কবিতা পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কিংবদন্তীর আসন তুলে ধরে ছিলেন।
সম্পাদক ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর দুয়েকটি কাজের কথা এ মুহূর্তে আমরা স্মরণ করতে পারি। তিনি নিজেই বলেছেন, জীবনানন্দ দাশ পরিচিত মানুষ দেখলে দেখা হওয়ার ভয়ে কিছুটা রাস্তা ঘুরে যেতেন। তাঁর সময়ের কবিরা জীবনানন্দকে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না। কিন্তু ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ (১৯৩৬) প্রকাশের পর বুদ্ধদেব বসু তাঁর জন্য অনেকখানি জায়গা ছেড়ে দিলেন, নতুন যুগের কবিতাকে চিহ্নিত করলেন। সমকালীন কাব্য-হিংসা যতই থাক না কেন, এই বদান্য তাঁর মধ্যে ছিল। নজরুল অসুস্থ হওয়ার পরে সমকালীন উদাসীনতা ও উপেক্ষা যখন তিনি ক্লীষ্ট তখন বুদ্ধদেব বসু কবিতা পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা নজরুলকে নিবেদন করছেন। নিজেকে দিয়ে, জীবনানন্দ দাশকে সমকালীন অন্য লেখকদের দিয়ে আলোচনা করে একটি আলোকের পথ নির্দেশ করতে চেয়েছেন। নজরুল গবেষকরা তাঁর নজরুল ভক্তি নিয়ে যতই সংশয় প্রকাশ করুন না কেন; বিশেষ করে আধুনিক কবিতা সম্পাদনা করতে গিয়ে নজরুলের প্রতি তিনি সদাশয় হতে পারেন নি বলে প্রমাণাদি খাড়া করা অসম্ভব নয়। তবু নজরুলকে নিয়ে, জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে হাজারো কাব্য হিংসের মধ্যে তিনি যতটুকু করেছেন সে-ই বা ক’জনে করেন? অতি আধুনিক বিদেশি সাহিত্যের প্রবেশও বলা চলে বুদ্ধদেব বসুর হাত ধরে। ফরাসি কবি বোদলেয়ারের বাংলা কাব্যে প্রতিষ্ঠার এক অনন্য কৃতিত্ব তাঁর। বোদলেয়ার তাঁর অনন্য ও শ্রেষ্ঠ কর্ম। সম্পাদনা অনুবাদ ও টীকাটিপ্ননিসহ গ্রন্থটি অনবদ্য। গ্রন্থটি এই জন্যই শ্রেষ্ঠ নয় যে, বোদলেয়ারের কবিতা সুন্দর অনুবাদ করা হয়েছে। বরং, বুদ্ধদেব বসুর এ কাজটি যে-কোনো কালে কবিদের পরিশ্রম ও নির্মাণে অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতা রাখে। তার আধুনিকতা কেবল বোদলেয়ারে সীমাবদ্ধ থাকে নি, প্রাচীন ভারতের রত্নরাজি থেকেও তিনি সমান মমতায় মুক্তো চয়ন করেছেন, কালিদাসের মেঘদূত তার প্রমাণ। 
বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধের প্রতি পাঠক আগ্রহ এখনো হারিয়ে ফেলেন নি এ জন্য যে, তাঁর রচনা পাঠে পাঠককে কতিপয় রীতি পদ্ধতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। একজন স্পর্শ কাতর অনুভূতিময় পাঠক যেভাবে কোনো রচনার রসাস্বাদন করে থাকেন, বুদ্ধদেব বসু ঠিক একই ভঙ্গিতে রচনাগুলো বর্ণনা করেন। যেন প্রবন্ধ নয় পাঠকের প্রতিক্রিয়া। এমনকি অমিয় চক্রবর্তীর মতো কবি, গোড়াতে যার প্রতি তাঁর পছন্দ ছিল না; তাঁরও প্রথম বইটা নিয়ে তিনি যখন বলেন, ‘বিষ্ময়কর বই; খুলে পড়তে বসলে পাতায়-পাতায় মন চমকে ওঠে। বাংলা কবিতার পাঠকের কান ও মনের যতগুলো অভ্যাস আছে, তার একটাও প্রশ্রয় পায় না, বরং প্রহৃত হয়। কিছুরই সঙ্গে এ কাব্য মেলে না; সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বা বিষ্ণু-দের মতো ‘দুরূহ’ কবির পাঠাভ্যাসও বিশেষ কাজে লাগে না এখানে। এ একেবারেই আধুনিক, একেবারেই অভিনব। বলতে ইচ্ছে হয়, উগ্র রকমের আধুনিক। ঠাট্টা করতে লোভ হয়। কিন্তু দুচারটি কবিতা পড়তে পড়তে উপহাসের ঝোঁকটা লজ্জিত ও পরাস্ত হয়; বিষ্মিত মন সানন্দে স্বীকার করে যে এখানে প্রকৃত কবি শক্তির সাক্ষাৎ পেলুম।’
নতুন কোনো রচনাকে পরিচিত করে দেবার এটি বুদ্ধদেব বসুর চিরাচরিত ধরন। কোনো নতুন কবি আসার আগে, তার কবিতা ব্যাখ্যার নিয়ম থাকে না। পুরনো নিয়মে তাকে ধরা যায় না। কোনো একটি পদ্ধতির মধ্যে তাকে ফেলে আলোচনা করার ঝুঁকি থাকে। এমনকি চিরাচরিত পাঠাভ্যাসও ব্যাহত হয়। বুদ্ধদেব বসু আধুনিক পাঠকের সেই পাঠাভ্যাস তৈরির ক্ষেত্রে আজীবন কাজ করেছেন। তিনি এমনভাবে পঠিত ও প্রাজ্ঞ বিষয়াদি তাঁর রচনায় তুলে আনেন; মনে হয় এটা যেন তার দায়; না বললে যেন সত্য গোপন হয়।
তিরিশ পরবর্তী আমাদের যে সাহিত্যের পথ- তার অনেকখানি বুদ্ধদেবের তৈরি। তাঁকে উল্লেখ না করে তাঁকে স্মরণে না এনে সাহিত্যের পথে এগুনো যায় না। একজন প্রকৃত কবি কিভাবে কবি হয়ে ওঠেন- সে পাঠ নিতে হয় বুদ্ধদেবের কাছে। তাঁর- ‘হঠাৎ আলোর ঝলকানি’ (১৯৩৫), ‘আমি চঞ্চল হে’ (১৯৩৭), ‘উত্তরতিরিশ’ (১৯৪৫), ‘কালের পুতুল’ (১৯৪৬), ‘সাহিত্য চর্চা’ (১৯৫৪), ‘কবিতার শত্রু ও মিত্র’ (১৯৭৪) না পড়ে সাহিত্যের পথে হাঁটা যায় না।
তিরিশে বুদ্ধদেব বসুর কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা সবার শীর্ষে কিনা সে বিতর্ক থাকতে পারে; তাঁর উপন্যাস তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃষ্টি কর্ম থেকে আলাদা হলেও তাঁর প্রতিষ্ঠা তাদের পংক্তিতে নাও হতে পারে; নাটক কিংবা শিশু সাহিত্যে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বি মিলবে হামেশায়; কিন্তু প্রবন্ধ সাহিত্যে তিনি একক না হলেও শ্রেষ্ঠ- তাতে কোনো বিতর্ক নেই। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না- তাঁর এবং তাঁর সমকালের কবিতা জানার জন্য, কবিতার ইতিহাস সংগঠিত করার জন্য, গৌণ এবং এমনকি অনেক মুখ্য কবিকে জানার জন্য আমাদের বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধে আশ্রয় খুঁজতে হয় বা হবে। 




এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন

close