শিরোনাম :

প্রচ্ছদ » সাহিত্য

উদ্ধত রফিক আজাদ

সোম, ২১ মার্চ'২০১৬, ৩:১৩ অপরাহ্ন


উদ্ধত রফিক আজাদ   
কুমার দীপ

ষাটের দশকে আবির্ভূত, বাংলা ভাষার অন্যতম পৌরুষদীপ্ত কবির নাম রফিক আজাদ। প্রেম তাঁর কবিতার অনন্য অনুষঙ্গ হলেও অন্তঃকরণে তিনি উদ্ধত কলমের কবি। ঔদ্ধত্য তাঁর কবিতার মজ্জাগত বিষয়। জীবনেও তাঁর ঔদ্ধত্যের তেমন কমতি ছিলো না। এই ঔদ্ধত্য ইতিবাচক। এই ঔদ্ধত্য অকপট অনুভূতি প্রকাশের ঔদ্ধত্য। এই ঔদ্ধত্য নিজের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ধারণ ও প্রকাশ করবার ঔদ্ধত্য। এই ঔদ্ধত্য মানুষের অমানুষতাকে তীব্রভাবে আঘাত করবার ঔদ্ধত্য! ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি, তৃতীয় শ্রেণির একজন বালকের; ভাষা-শহিদদের সম্মানে খালি পায়ে মিছিলে অংশগ্রহণের ভেতর দিয়েই বোধ করি সেই ঔদ্ধত্যের শুরু। ১৯৭১ সালে কলম ফেলে বন্দুক হাতে সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে জীবনকে বাজি রেখে শরীরী ঔদ্ধত্যের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন রফিক আজাদ। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর একান্ত সহযোগী হিসেবে দুঃসাহসী সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেওয়া এই কবি কলম হাতেও কম ঔদ্ধত্য দ্যাখান নি। ‘মানব যৌবন ও স্থান কাল পরিবেশ’ নামক একটি কবিতায় বলেছিলেন—
---------“আমি রফিক আজাদ বলছি :
---------তোমরা যারা নকল রাজা, ভাঙা কলস, নকলনবিশ নফর গোলাম
---------তোমাদের সব দুর্বলতা, ছিদ্র-টিদ্র, আমার সকলকিছুই জানা—
---------খোঁড়া পায়ে লম্ফ-ঝম্ফ করেও কিছু লাভ হবে না-উপায়বিহীন ;
---------দেয়াল-টেয়াল তুলে দিচ্ছি অযথা লাফ দিয়ে বাবা পা ভেঙোনা ;
---------মধ্যবিত্ত আত্মা থেকে বেরুতে যে আর পারো না---

--------------*** *** ***

--------একমাত্র এই শ্রীমান ছাড়া
--------নিজের মুখোমুখি হতে কোনো শালা
--------সাহস পায় না।”
এমন সাহসী, ঔদ্ধত্যপূর্ণ উচ্চারণ রফিক আজাদ ব্যতীত বাংলা কবিতায় বিশেষ লক্ষণীয় নয়। আর স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে, বিরাট খাদ্যাভাব দ্যাখা দিলে; তারই বীভৎস এক রূপকে প্রত্যক্ষ করে লেখা সেই ‘ভাত দে হারামজাদা, তা না হ’লে মানচিত্র খাবো।’ নামের পঙক্তিটি! উদ্ধত উচ্চারণের এক চূড়ান্ত নমুনা সেটি। অনাবৃষ্টির আগুন যেমন চৈত্রের শস্যক্ষেত্রকে ব্যাপক পুড়িয়ে দেয়, তেমনি আদিমতম প্রবৃত্তি ক্ষুধার দহনে জ্বলতে থাকে মানুষের শরীর। নিরন্ন জনতা গাড়ি-বাড়ি চায় না, চায় কেবল দু’বেলা দু’মুঠো ভাত খেতে; সে যত তুচ্ছ অবস্থাতেই হোক। নিরন্ন জনতার কণ্ঠস্বরে কবি বলেন :

-------“আমার সামান্য দাবি : পড়ে যাচ্ছে পেটের প্রান্তর-
-------ভাত চাই-এই চাওয়া সারাসরি- ঠাণ্ডা বা গরম,
-------সরু বা দারুণ মোটা রেশনের লাল চাল হ’লে
-------কোনো ক্ষতি নেই-মাটির শানকি ভর্তি ভাত চাই :
-------দুবেলা দুমুঠো হ’লে ছেড়ে দেবো অন্যসব দাবি।”

এই সামান্য দাবি পূরণ না হলে সমস্ত রাজ্যে দক্ষযজ্ঞ বাধিয়ে দিতে চান তিনি। সবকিছুকেই করে তুলতে চান রাক্ষুসে ক্ষুধার কাছে উপাদেয় উপাচার।সামান্য ভাতের ক্ষুধা পরিণত হতে পারে সর্বপরিবেশগ্রাসীরূপে। গাছ-পালা, নদী-নালা,গাম-গঞ্জ,পতাকাসহ খাদ্যমন্ত্রী; এমনকি স্বদেশের মানচিত্রও হতে পারে তার ক্ষুন্নিবৃত্তির অনিবার্য অনুষঙ্গ! এ অবস্থায় আজাদ বলেন,

-------“ভাত দে হারামজাদা, তা না হ’লে মানচিত্র খাবো।”
রফিক আজাদের নামের সঙ্গে মিশে গেছে এই পঙক্তিটি এবং এটাই তাঁর কবিতার সবচাইতে উচ্চারিত, আলোচিত ও সমালোচিত শব্দবন্ধ। যারা রফিক আজাদের কবিতা পড়েন নি, তারাও তাঁকে ‘ভাত দে হারামজাদা’ কবিতার কবি হিসেবে মুখস্থ করে থাকেন। এই কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার পরে কবির জীবন হয়ে উঠেছিলো রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এমনকি বাংলাদেশের কবিতার কোনো কোনো পর্যবেক্ষকও কবিতাটি নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। অনেকেই অবশ্য কবিতাটির সারবার্তাকে মূল্যবান হিসেবেই গ্রহণ করেছেন।
কিন্তু কবি নিজেই এক সময় বলেছেন, ‘ভাত দে হারামজাদা’ কবিতাটি লেখা ভুল ছিল! ক্যানো? তিয়াত্তর-চুয়াত্তর সালের খাদ্যাভাবকে কেন্দ্র করে পত্রিকায় প্রকাশিত দুটো স্পর্শকাতর ছবির প্রতিক্রিয়াস্বরূপ কবিতাটি লিখেছিলেন রফিক আজাদ। একটি ছিলো একজন অনটনপীড়িত একজন নারীর শাড়ির পরিবর্তে মাছ-ধরার জাল পরে সম্ভ্রম রক্ষা করার ছবি; অপরটি ক্ষুধার্ত একটি পুরুষের অন্যের উদ্গীরিত বমি খাওয়ার ছবি। অথচ এই দুটো ছবিই নাকি সাজানো নাটক ছিলো। কবির মুখ থেকেই জানা যায়—
বঙ্গবন্ধুর ওই সময়ে ওই রংপুরে সবসময়ই তিন মাস খাদ্যাভাব ছিলো। সেইটাকে কাজে লাগাইছে বঙ্গবন্ধুর বিরোধীরা। পাকিস্তান যে হারছে, ওই হারা পাকিস্তানের পক্ষে ছিলো অনেক...। তারা সমানে ওই জায়গাটা নিয়া পত্র-পত্রিকায় লিখছে। বিশেষ করে দুর্ভিক্ষ যতটা না হোক, মিডিয়ার একটা চক্রান্ত ছিলো, যেমন জাল পরিয়ে বাসন্তীকে দেখানো হইছে, ইত্তেফাকে, যেন না খেয়ে অভাবে জাল পরে আছে- শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে ইত্তেফাকের ফটোগ্রাফার আফতাব তাকে একশো টাকা দিয়া জাল পরাইছে। আমরা এতো বোকা ছিলাম যে, একটা মেয়েলোক জাল পইরা সম্ভ্রম রক্ষা করতে পারে! মাছ ধরার জাল, সেইটায় কি সম্ভ্রম রক্ষা করবে! আমরা বুঝি নাই! শালা মারাও গেছে। শালা মারা যাওয়ার আগে বলেছে যে, আমার কাজ হইলো ছবি তোলা, বিখ্যাত হওয়া। ও বিখ্যাত হইছে। সে কী করেছে, রংপুর স্টেশনে একজনের বদহজম হইছে, বমি করেছে, সেই বমির উপর একটা ক্ষুধার্ত লোককে বলা হয়েছে যে- মুখ লাগানোর চেষ্টা করবি। লাগাতে হবে না, তুই খালি ভঙ্গি করবি যে তুই এটা খাইতাছস। একশো টাকা পাবি। এইটা কুত্তার বাচ্চার ফটোগ্রাফার পরে স্বীকার করছে। এগুলো সাধারণ মানুষের মনে সাংঘাতিক ছাপ ফেলেছে, তাদের মনে প্রচন্ড ক্রোধ জমে গেছে। আমারও। তো এই ক্রোধ থেকেই ‘ভাত দে হারামজাদা’ লেখা।
আবির্ভাবের সময়কাল হিসেবে ষাটের প্রথমলগ্নের কবি রফিক আজাদ। এই সময়ে বাংলাদেশের কবিতায় হতাশা-হাহাকার আর ক্ষোভ চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছিলো। রফিক আজাদের মতো স্যাড জেনারেশনের শীর্ষকবির কবিতায় এর প্রভাব স্বভাবতই একটু উত্তুঙ্গ ছিলো। স্বাধীনতার পরেও এই ধারা অব্যহত থাকে। কারণ দৈশিক স্বাধীনতাও শেষ পর্যন্ত স্বস্তি দিতে পারে না সাধারণ মানুষকে। ‘মাটির উনুন, শানকিতে শাদা ভাত,/পরিমিত নুন স্বাদু তামাকের তাঁবু,/ শাড়ীর ভেতরে এক আলুথালু নরম শরীর,/শীতল পাটির সুখ, হাতপাখা, আশার পিদিম;’ (তুমি চাও)-- এর মতো সামান্য চাওয়া পূরণ হতে না হতেই ঘটে যায় বিরাট রাজনৈতিক পরিবর্তন। স্বাধীনতার মহানায়ক আর নায়কদের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ বইতে থাকে বিপরীত হাওয়ায়। এ সময় নিরীহ কৃতদাসোচিত মানুষের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে আজাদ লেখেন, ‘তুমি যেখানেই যাও/ এসবের কিছুই পাবে না; / সঙ্গে সঙ্গে যাবে এক বেতার গ্রাহক যন্ত্র, / নোংরা ড্রেন, পচা জল, হলুদ পত্রালি, ক্বাথ, চিমনির ধোঁয়া, / দূষিত বাতাস আর গভীর রাত্রিতে ভারি বুটের আওয়াজ’।
যেখানে মানুষের মৌলিক চাহিদার ন্যূনতম প্রার্থনাও মঞ্জুর হয় না, সেখানে অজস্র মানুষ থাকলেও তারা যে মনুষ্যনামসর্বস্ব দ্বিপদমাত্র, তা বলাই বাহুল্য। এ অবস্থায় জনমানুষ হয়ে পড়ে নির্বিকার, বাকরুদ্ধ। যখন ‘মানুষ নামের ফাঁপা ফানুস / নির্বিবাদে / মুখের কথা বুকের মধ্যে লুকিয়ে ফেলে,/ চোখও কোনো ভাষা বলে না!’(মানুষ দেখি), তখন সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা, পুণ্যতোয়া নদীনিহিত এই স্বদেশ ভূমির ‘অন্তহীন সম্ভাবনাময় ঝরনা স্বচ্ছতোয়া/ ঘৃণার্হ থুথুর মতো / মুহূর্তে উবে যায় বিশুষ্ক বালিতে’।
এই দুঃসময়কে, মূল্যবোধহীন মনুষ্যবৃন্দকে, তাদেরই উপযুক্ত শব্দাবয়বে চিত্রায়িত করেন রফিক আজাদ।

--------“চতুর্দিক সংখ্যাতীত শব প্যান্টশার্ট পরে
--------বীর্যহীন, নম্রমুষ্টি, নতচক্ষু, পরাভূত সৈনিকের মতো
--------হাঁটাচলা করে।

-----------*** *** ***

---=----এই দেশে আজ
00-=----শস্যক্ষেত্রগুলি পর্যন্ত বিমুখ উৎপাদনে
00------গবাদি পশুর হাড়-জিরজিরে দেহে দোহনের যোগ্য দুগ্ধ নেই...” (এ কেমন কাল এলো)



-==----মানুষের ভণ্ডামি, নোংরামি আর গাঁধামির কুতুব মিনার দেখে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ রফিক আজাদ লেখেন,
==-----“আমার ত্বকের নিচে আছে এক মৌলিক কুকুর!
--==---আমাকে উলঙ্গ করে উঠে আসে ত্বকের ওপরে,
---==--ভুলে যায় ইস্টানিস্ট, মানবিক আচরণবিধি” ----(আমার ত্বকের নিচে)

মনুষ্যসমাজের প্রতি প্রবল বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন কবি। পঙক্তিতে তুলে ধরেন মানুষের অমানুষতার প্রতি প্রবল আক্রোশ। রফিক আজাদের প্রগাঢ় জীবনবাদ আর শৈল্পিক ঔদ্ধত্যের অতুল বিষোদ্গার প্রকাশিত হয়েছে আত্মজীবনীমূলক কবিতা ‘অটোবায়োগ্রাফি অব অ্যান আননোন বেঙ্গলি’ কবিতায়। মানুষ নামধারী প্রাণীটির কথা বা বক্তৃতা শোনার চেয়েও গভীরতর অর্থবহ মনে হয়েছে গরুদের ভাষা। মানুষের হাম্বা ডাকটাই বরং অবোধ্য হয়ে উঠেছে সেখানে । এবং শেষ পঙক্তিতে আজাদসুলভ স্টাইলে মানবিক মূল্যবোধহীন মানুষ নামধারী প্রাণীটির প্রতি প্রকাশিত হয়েছে চরমতম ঘৃণা-

-------“মানুষ শব্দটি লিখে আমি তাতে মুতে দিতে চাই।”
অর্থবল, লোকবল কিংবা ক্ষমতার বল; কোনোটাই যেহেতু কবিদের থাকে না, সেহেতু কলমের ফলাতেই তাঁরা ঘৃণার তীর ছোঁড়েন সমাজের দুর্বৃত্তদের প্রতি। কেউ কিছুটা নমনীয় ভাষায়, কেউ তা করেন তীব্রতায়। রফিক আজাদ অধিকাংশ সময়েই তা করেছেন তীব্রতায়। পারিপার্শ্বিক চাপ আর জীবনের বাঁকে বাঁকে নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে কখনও কখনও নিজের কলমকে নমনীয় করবার কথা ভেবেছেন, লিখেছেন, ‘হে কলম, হে বলপেন, হে আমার বর্বর প্রকাশ-ভঙ্গিমা- এই নাকে খত দিচ্ছি আর কখনো গালমন্দ পাড়বো না,/আপনাদের ভন্ডামিকে শ্রদ্ধা করতে শিখবো,/আপনাদের অপমান হজম করার অপরিসীম ক্ষমতাকে সম্মান করবো,/ আর কোনোদিন এমনটি হবে না, হে মহামান্য মধ্যবিত্ত রুচিবোধ,/আপনাদের মতো সব অপমান হজম করে এখন থেকে,/নাইট সয়েল বানিয়ে ফেলে দেবো শরীরের বাইরে-/হে বন্য লেখনী, হে অমোচনীয় কালি, হে ইতর বলপেন, /নত হও, নত হতে শেখো.../শান্ত হও ভদ্রলোকদের মতো/আড়াল করতে শেখে অপ্রিয় সত্যকে,/ প্রিয় মিথ্যা বলা শিখে নাও, বিক্রি করে দাও তোমার বিবেক-’ (নত হও, কুর্নিশ করো)।
কিন্তু তা তিনি করেন নি কখনই। করেন নি, ক্যানোনা, তিনি বিবেক বিক্রেতা হতে চান নি; বিবেক দাতা হতে চেয়েছেন। ‘কেন লিখি’ কবিতায় লিখেছেন:

--------------“নির্বিবেক মধ্যবিত্ত পাঠকের পরম্পরাময়

--------------মাংসল পাছায় খুব কষে লাথি মারা সম্ভব হয় না বলে

--------------লাথির বিকল্পে লেখা, বারবার, মুদ্রিত পৃষ্ঠার

--------------মাধ্যমে পাঠাই.. ..।” 




এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন

close