শিরোনাম :

প্রচ্ছদ » সাহিত্য

অনন্তের চোখ

মঙ্গল, ০৫ এপ্রিল'২০১৬, ১:১৪ অপরাহ্ন


অনন্তের চোখ  
আনোয়ারুল হক
পৈরতলার মোড়ে এসে গোকর্ণ ঘাটের দিকে যেতে হাইওয়ে থেকে নেমে এলো রিক্সাটা। রাস্তার মাথায় অনাবশ্যক স্পিড ব্রেকারের শিরে উঠে নামার সময় ঠক করে আছাড় খেল বাহন। সঙ্গে সঙ্গে ত্রিচক্র যানটির ডান দিকের চাকা ওর পেটের সমুদয় বায়ু ত্যাগ করে রাস্তায় বসে পড়লো। কালাম সাহেব বিসমিল্লাহ বলে সাড়ে বারোটার দিকে স্টেশন থেকে বের হয়ে মনে মনে স্থির করেছিলেন রাস্তায় চলতে ফিরতে অবাঞ্ছিত যাই ঘটুক না কেন তিনি মেজাজ খারাপ করবেন না। তাই রিক্সা বসে যাওয়াতে যেন কিছু হয়নি এমন ভাব নিয়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে রিক্সা থেকে নামলেন।
চাকা পাংচার হওয়াতে যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারত, হয়নি যে তা আল্লাহপাকের দয়া কি বলো রিক্সাওয়ালা ভাই, ঠিক কিনা?
কালাম সাহেবের জিজ্ঞাসায় মাঝ বয়সের রিক্সাওয়ালা অমায়িক হাসে। বলে, জ্বি সার, তয় আমার কামাইয়ের পেডে লাত্থি। কুনু কুনু পাসিঞ্জার আছে বড় কপাল পোড়া। মুখ দেইখ্যা তো কিছু বুজা যায় না, বুজজেন।
রিক্সাওয়ালার বাক্য ব্যবহারের জন্য কালাম সাহেবের মেজাজ আবার চড়ে যাচ্ছে। শীতল চোখে চালকের দিকে তাকাতেই সে তার মুখে ব্রেক চাপল। হাতে সময় আছে আর মেজাজটাকে বশে আনার জন্যে চায়ের দোকানের দিকে গেলেন। চা খেতে খেতে শুনলেন আজান দিচ্ছে। সিদ্ধান্ত নিলেন, জোহরের নামাজ পড়ে তারপর গোকর্ণ ঘাটের দিকে যাবেন। তখন নবীনগর যাওয়ার জন্য যে লঞ্চ পাবেন তাতেই চড়বেন।
চায়ের দোকানের সামনে রাস্তার উল্টো পাশে মসজিদ চত্বর। সেদিকে যেতেই দেখলেন, মসজিদ থেকে কয়েক গজ দূরে আধ নেংটা এক পাগল চিৎ হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। দেহে প্রাণের সাড়া আছে কিনা বুঝা যায় না। মসজিদে নামাজ পড়তে আসা কোনো মুসল্লি তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। বরং নাকে পাঞ্জাবির কোণা অথবা রুমাল চেপে ধরে দ্রুত মসজিদে নামাজের জন্য ঢুকে যাচ্ছে। বিষয়টা কালাম সাহেবের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃৃষ্টি করল। ডাক্তার হিসেবে তার সুনাম কেবল পেশার জন্যই নয়, তার দয়াময় আচার-আচরণের জন্যও বটে। তিনি অন্যান্য নামাজিদের মতো অসুস্থ লোকটাকে এড়াতে পারলেন না।
কালাম সাহেব ত্রস্ত পায়ে লোকটার কাছে এগিয়ে গেলেন। গুটি বসন্তে ছেয়ে আছে তার সারা শরীর। নির্দ্বিধায় হাতের নাড়ি দেখলেন। তারপর খেয়াল করে দেখলেন, কোমর থেকে তার শরীরের নিচের অংশ ঘায়ে-পুঁজে বিচ্ছিরি অবস্থা হয়ে আছে। উঠে দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই তার। বয়স অনুমান করা যায় না তবে লোকটার সাদা শশ্রুমণ্ডিত মুখটি অবাক করে দেবার মতো কমনীয়।
ডাক্তারের মন করুণায় বিগলিত হলো। দুঃখী মানুষের কষ্ট, অসুস্থ গরিবের আহ্বান তিনি কখনই উপেক্ষা কিংবা এড়িয়ে যেতে পারেন না। ভুলে গেলেন তাকে যে বিকেলের মধ্যে নবীনগরে পৌঁছতে হবে। হাতের ইশারায় একটা রিক্সা ডাকলেন। ব্রিফকেসটা রিক্সাওয়ালার হাতে ধরিয়ে দিয়ে নামাজী লোকদের বিস্মিত দৃষ্টিকে হেলায় জামা থেকে ধুলো ঝেড়ে ফেলে দেওয়ার মতো টোকা দিয়ে ফেলে অসুস্থ লোকটাকে পাজাকোলা করে রিক্সায় উঠে বসলেন।
হাসপাতালে পৌঁছে নিজের পরিচিতির জন্যে প্রয়োজনীয় কাজগুলো করতে বেশি বেগ পেতে হলো না। উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করে হাসপাতাল ছাড়তে ছাড়তে বিকাল হয়ে গেল। ঘড়ি দেখলেন, পাঁচটার লঞ্চটা ধরা যাবে। কী মনে করে বের হওয়ার আগে লোকটাকে দেখতে গেলেন। চোখ খুলে উদভ্রান্তের মতো চারদিকে তাকাচ্ছে সে। কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই কালাম সাহেবের দিকে তাকাল। এমন উজ্জ্বল দৃষ্টি সচরাচর দেখা যায় না।
কোনো কোনো চোখ আছে দেখলেই মনে হয় ঝকঝকে কাচের আয়না। ওই চোখ তেমনি। কোনো কথা হলো না। দৃষ্টি বিনিময়ে লোকটি হাসল। হাসিটিও সুন্দর। হাতের ইশারায় কালাম সাহেবকে বিদায় দিল। তিনি ফেরার পথে কেন জানি অনুভব করতে লাগলেন যত দূরেই যাচ্ছেন না কেন অসুস্থ মানুষটির চোখের দৃষ্টি তার পিঠের উপর থেকে যেন কোনোভাবেই সরে গেল না।
দুই.
তিতাসের ফুরফুরে হাওয়ায় কোনো অঘটন ছাড়াই প্রায় ভাসতে ভাসতে লঞ্চঘাটে এলেন ডাক্তার কালাম। জেটিতে ছাড়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে লঞ্চ। নদীপথে চলাচলে তার ভীতি থাকলেও বাধ্য হয়েই তিনি এ পথে যাতায়ত করে থাকেন। কেননা, নবীনগর থেকে বাস সার্ভিস মোটেও ভালো নয়। রাস্তা সরু এবং ঠাসা যাত্রীবোঝাই এ সার্ভিসগুলো অন্যন্যেপায় সড়ক যাত্রায় যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এ কারণে ডাক্তার ওই পথ এড়িয়ে নদীপথে যাতায়াত করে থাকেন। জলপথে সবচে বড় সুবিধা পলিউশন ফ্রি এটমোসফেয়ার। ধোঁয়া, পেট্রোলের গন্ধে শরীর গুলায় না। বরং খোলা হাওয়ায় গন্তব্যে পৌঁছার আগ পর্যন্ত শরীর মন চাঙ্গা থাকে।
গোকর্ণ ঘাট থেকে নোঙর তুলে লঞ্চ এখন মাঝ নদীতে। ঘণ্টাখানেক সময় পার হয়েছে। ডাক্তার সারাদিনের ধকলে ক্লান্ত ছিলেন বলে কেবিনের লম্বা সিটে ব্রিফকেসটা মাথার নিছে দিয়ে শুয়ে বিশ্রাম নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ঘুমাবার আগে সন্ধ্যার মুখে আকাশটাকে মেঘমুক্ত পরিষ্কারইতো দেখেছিলেন। ঘুম ভাঙল প্রচণ্ড বাতাসের শোঁ শোঁ গর্জনে। ঘুম চোখে স্তম্ভিত হয়ে দেখলেন ঝড়ো বাতাস, বৃষ্টি এবং গাঢ় কালো কালিতে চুবিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া আকাশ। আর কিছুক্ষণ পরপর আকাশ চিরে বিদ্যুত চমকের সাথে সাথে বাজ পড়ার প্রচণ্ড শব্দে কানে তালা লাগার জোগাড়।
দেখলেন কেবিনের ভিতর তিনি ছাড়া আর কেউ নেই। সামনে তারের জালির ফাঁক দিয়ে দেখা যায় সারেং দেড়শ’ ফুটের কম নড়বড়ে লঞ্চটাকে সামলাতে তার কসরতের অন্ত নেই। কেবিনের বাইরে কিছু লোক নিজেদের মধ্যে কথা চালাচালি করছে উচ্চস্বরে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি কালাম সাহেবের কাছে স্বাভাবিক মনে হলো না।
বাতাসের প্রচণ্ড তোড়ে নদীতে বড় বড় ঢেউ তৈরি হচ্ছে। তাতে লঞ্চের দুলুনিতে ভিতরে বসে থাকা যাচ্ছে না। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ এই সময়ের তীব্র অন্ধকারে নদী, নদী তীর বলে কোনো কিছুই দেখা যায় না। লঞ্চ চালনা বিপজ্জনক হয়ে ওঠছে। তিতাসের দুই তীর ছাপিয়ে দিগন্ত বিস্তৃত হাওয়ার চাপে পানির গভীরতা দেখেশুনে লঞ্চটিকে চালাতে হয়। তা না হলে পানির নিচে ডুবে থাকা অদৃশ্য কোনো ফাঁদে জলযান আটকে যেতে পারে।
অবস্থা এমন যে গভীর অন্ধকারে কিছুই ঠাহর করা যায় না। এদিকে আবার ঢেউয়ের তোড় সামলানোর জন্যে লঞ্চের ইঞ্জিন বন্ধ করা যাবে না। তা করলে বাতাসের ধাক্কায় আছড়ে পড়ে জলযান ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।
প্রবল ঝড়ের তাণ্ডব দেখে ভয় পেয়ে নিচতলায় খোলের ভিতরে বসা যাত্রীদের মধ্যে হৈ চৈ পড়ে গেল। জানালা দিয়ে নদীর ঘোলা জল গলগল করে খোলের ভিতর ঢুকছে। তীব্র ঠাণ্ডা জলের তোড় সইতে না পেরে দশ-বারোজন মেয়ে-পুরুষের একটা দল হুড়মুড় করে কেবিনের ভিতরে প্রবেশ করল। কালাম সাহেব দেখলেন, ওরা ভয়ে আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছে।
কালাম সাহেব অবস্থা বুঝে বেশ চিন্তিত হলেন। নবীনগরে গত দুই বছরের চাকরি জীবনে এমন দুর্যোগের মুখে কখনো পড়েননি।
খালাসি, কেরানি, কাজের লোকের একতলা দোতলায় ছুটাছুটি ব্যস্ততা, যাত্রীদের আহাজারি কন্নাকাটি পরিস্থিতিকে করে তুলেছে ভয়াবহ। কেবিনের খোলা দরজা দিয়ে বাইরে এসে ডাক্তার মনে মনে প্রমাদ গুনলেন। এবার সত্যিই ভয় পেলেন স্রোতের টান দেখে। সাঁতার তিনি ভালোই জানেন। তবে এ রকম স্রোত আর ঝড়ের তাণ্ডবে অতি দক্ষ সাঁতারুও অনেক সময় থই পায় না। মনে ভাবনাটা এলো ঠিকই। লঞ্চটা যদি ডুবে যায় বাঁচতে পারবেন তো! মোবাইলে বাসায় একটা মেসেজ পাঠালেন, পৌঁছে গেছি। দোয়া কর।
মেসেজটা পাঠিয়ে মোবাইলটা ডান পকেটে চালান করতে না করতেই প্রবল ঢেউয়ের ধাক্কায় জলযানটা একবার ডানে এবং একবার বামে কাত হলো। উপরে নিচে মরণ চিৎকার দিল যাত্রীরা। ডাক্তার ধাক্কাটা সামলাতে না পেরে দুইদিকের দুলুনিতে মেঝেতে পড়ে গেলেন। যাত্রীদের একজন টলতে টলতে কাঁপা উচ্চস্বরে আজান দিতেই ওদিকে কেবিনের ভিতরে দুইজন মধ্য বয়সী মহিলা না-কি কান্না কাঁদতে লাগল। এ সময় লঞ্চের কেরানি, খালাসি, সুকানি সবাই ইঞ্জিন ছেড়ে উপরে এসে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে গেল। সম্ভাব্য পতনের সাথে সাথেই যেন নদীতে ঝাঁপ দিতে পারে। সারেং লঞ্চটাকে সামলাবার চেষ্টায় হুইল শক্ত হাতে ধরে আছে। এখন লঞ্চ চালাবার কোনো ব্যাপার নেই। বাতাসের গতি আর ঢেউয়ের তোড়ে জলযান যেদিকে যায়, যাবে। ভয়াল প্রকৃতিই এখন মূল পরিচালক।
হঠাৎ জলযানটি নব্বই ডিগ্রি কোণে ঘুরে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ডান দিকে কাত হলো সে। চারদিকে ঘন অন্ধকার, ভেজা বাতাসের প্রবল ঢেউয়ের তোড় এবং ঝড়ের ঝাপটায় কালাম সাহেব টের পেলেন তিনি জলের স্রোতে ভেসে যাচ্ছেন। ব্রিফকেসটা অনেক আগেই কোথাও গেছে। এ সময় সাঁতার কোনো কাজে লাগে না। ডাক্তার তার শরীরের ওপর টন টন জলরাশি আছড়ে পড়তেই বুঝলেন তিনি ডুবে যাচ্ছেন। দম নেওয়ার ফুরসত পাওয়া গেল না। চোখের সামনে ভেসে ওঠল স্ত্রী-কন্যাদের মুখ। মনে হলো আর বুঝি কোনোদিন দেখা হলো না!
এক ঢেউয়ের ধাক্কায় তিনে ডুবে যান সাথে সাথে আরেক ঢেউয়ের টানে তিনি ভেসে ওঠেন। খেলাটা শেষ হয়ে আসতে আসতে আরেকটা ঢেউয়ের উজানের টানে জলধির মাথায় চড়ে মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে যেতে যেতে কালাম সাহেব এক ঝলক কালো লালে মেশানো আকাশটাকে দেখলেন। দম নেওয়ার সময় পেলেন না, তলিয়ে গেলেন।
এবার আর কোনো আপনজনের কথা মনে হলো না। ঘোলা জলের তলদেশে নামতে নামতে চোখের উপর ভেসে ওঠলো একটি কমনীয় মুখ, দুটি চোখ। ফোকলা দাঁতে হাসছে। ঘাড়ের কাছে শার্টের কলারে মনে হলো চেপে ধরেছে কেউ। জ্ঞান হারাবার আগে দড়াম করে একটা ডিঙ্গি নৌকার পাটাতনে অবসন্ন শরীরটাকে পড়তে দেখলেন কালাম সাহেব।
পরদিন সকালে নবীনগর সদর হাসপাতালের বেডে যখন তার জ্ঞান ফিরল তখন কালাম সাহেবের বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে তিনি বেঁচে আছেন! সহকর্মী ডাক্তাররা তাকে ঘিরে আছে। জিজ্ঞেস করতেই তার এখানে আসার বিবরণ কেউ দিতে পারল না। এক সময় সকলেই তার কাছ থেকে সরে গেলে তিনি চোখ বন্ধ করতেই দেখতে পেলেন, অনন্তের ভিতর থেকে ঝকঝকে দুটি চোখ এখনো তাকে ছেড়ে যায়নি। ফোকলা গালে হাসছে। স্বচ্ছ কাচের আয়নার মতো এমন চোখ সচরাচর চোখে পড়ে না। 




এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন

close