শিরোনাম :

প্রচ্ছদ » মুক্তমন

‘আমার কথা মনে বুঝি নাই … ’

শুক্র, ০৮ এপ্রিল'২০১৬, ১২:৪১ অপরাহ্ন


‘আমার কথা মনে বুঝি নাই … ’  
এই তো সেদিনের কথা। উত্তরাঞ্চলের মাঠ-ঘাট-প্রান্তর জুড়ে যার সুর ছড়িয়ে থাকতো। যার মিষ্টি সুরের গান একটিবার শুনতে আগ্রহী আর ব্যাকুল হয়ে থাকতো পথে-প্রান্তরের সহজ-সরল মানুষগুলো। গ্রামের চাষী, গাড়িয়াল, রাখাল-খেটে খাওয়া মানুষজন কতই না আকুল হয়ে থাকতো যে মানুষটির গান শোনার জন্য। যার গান শুনে মানুষ যেমন কাঁদতেন, হাসতেন, তেমনি দারুণভাবে উজ্জীবিত হতেন। তিনি আর অন্য কেউ নন, তিনি এই দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান, ভাওয়াইয়ার কিংবদন্তি গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী নুরুল ইসলাম জাহিদ। সাড়ে তিন হাজারের অধিক গানের গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী তিনি। ভাওয়াইয়া গানের পাশপাপাশি তিনি লিখেছেন অসংখ্য আধুনিক, পল্লীগীতি, মারফতি, মুর্শিদী, ভাটিয়ালী ও দেশের গান।
মুক্তিযুদ্ধেও ছিলো তার সক্রিয় অংশগ্রহণ। মুক্তিযুদ্ধের সময় কুচবিহারের Welfare Centre for Evacuee Children-বেঙ্গল জোন থেকে প্রশিক্ষণ শেষে ক্যাম্পে ক্যাম্পে নিজের লেখা ও সুরারোপিত গান শুনিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করেছেন। যার সহযোদ্ধারা যুদ্ধ শেষে সার্টিফিকেট গ্রহণ করলেও যিনি মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নেয়ার প্রয়োজন বোধ করেন নি। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক গান লিখেছেন, এছাড়া দেশের বিশেষ দিনগুলো নিয়ে অসাধারণ সব গান লিখেছেন তিনি। তার গান চলচ্চিত্র এবং নাটকেও ব্যবহৃত হয়েছে। যার অনেক গানই এখনো বেতার ও টেলিভিশনে বিভিন্ন শিল্পীর কন্ঠে পরিবেশিত হয়ে আসছে। দীর্ঘ চার বছর রোগভোগের পর গত বছরের ১ এপ্রিল গুণী এই মানুষটি চলে গেছেন না-ফেরার দেশে।
সংগীতাঙ্গনের গুণী এই জনকে পেয়েছিলাম আপনজন হিসেবে। যার কাছে শিক্ষা-দীক্ষা দু’টোই নেওয়ার সুযোগ হয়েছিলো আমার। এ জন্য স্র্রষ্টাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই। আমি তৃতীয় শ্রেণীতে পড়াকালীন চিলমারী থানা পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গিয়ে গুণী এই মানুষটির প্রথম সান্নিধ্য পাই। উনি সেদিন প্রতিযোগিতায় বিচারকের আসনে বসা ছিলেন। আমার গান শুনে কাছে টেনে নিয়ে বলেছিলেন-তুমি অনেক ভালো করবে, চর্চা করো, সুযোগ পেলে তার কাছে যেন যাই। ব্যস এতোটুকুই প্রথম দেখায় প্রথম আশীর্বাদ। এরপর কতবার যে গুরুজীর কাছে গিয়েছি, মুগ্ধ হয়ে গান শুনেছি, শিখেছি, গুরুজীর রচনাকৃত নতুন নতুন গান দেখেছি, গানের ভাব বুঝার চেষ্টা করেছি, গান লেখার কলা-কৌশল শিখেছি।
গুরুজী একটি বেসরকারি সংস্থায় (টেরেডেস হোমস-সুইজারল্যান্ড) শিক্ষকতা করতেন। চাকুরীর সুবাদে চিলমারীতে থাকতে হতো তাকে। সপ্তাহের ৫ দিনই তিনি চিলমারীতে থাকতেন। আর সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ২টি রাত থাকতেন কুড়িগ্রামে নিজের পরিবারের সাথে। এ ভাবেই দীর্ঘ ২২ বছর শুধু চাকুরীর সুবাদে চিলমারী বন্দরে থাকতে হয়েছে গুরুজীকে।
ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাস উদ্দীনের সেই গানের চিলমারী বন্দরের মানুষ ভাওয়াইয়ার কিংবদন্তি নুরুল ইসলাম জাহিদকেও আপন করে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। গুরুজীর সৃষ্টিশীলতার আলোয় দীর্ঘ এই সময়ে পুরো চিলমারী তো বটেই, কুড়িগ্রাম, রংপুর তথা গোটা উত্তরাঞ্চল আলোকিত হয়ে উঠেছিলো। রংপুর বেতারের নিয়মিত অনুষ্ঠান ‘তিস্তা পাড়ের গানের অনুষ্ঠান ভাওয়াইয়া’ মানেই নুরুল ইসলাম জাহিদের বিশেষ ধারার, ভিন্ন গায়কী আর মিষ্টি সুরের গান। তিনি ছিলেন স্বভাব গীতকবি। কোথাও বসে আছেন, কোনদিকে তাকিয়ে আছেন তো বুঝতে হবে- তিনি ভাবের জগতে, গানের জগতে আছেন বা কোনো সৃষ্টির নেশায় মশগুল হয়ে আছেন।
একদিন বিকেলে গুরুজীর সাথে বসেছিলাম-হঠাৎ একটি পায়রা (কবুতর) উড়ে এসে ঘরের চালে বসলো। পায়রাটি চালে বসেই বাক-বাকুম বাক-বাকুম করে যেনো অস্থির করে ফেললো। আর অমনি গুরুজী লিখে ফেললেন-“আরে তুই ক্যানে একেলায় পায়রা রে/ও পায়রা আসিলু ঘুরিয়া/ওরে মোর মতন কি তোরো জোড়া গেইছে রে ভাঙিয়া॥/ বাক-বাকুম তুই করিসরে পায়রা/ও পায়রা চালোতে পড়িয়া/ও তুই কোনবা কথা কইসরে পায়রা/না বোঝোং শুনিয়া/ও তুই একেবার কও মনের কথারে/ও পায়রা জবান খুলিয়া/ওরে মোর মতন কি তোরো জোড়া গেইছে রে ভাঙিয়া॥”
ভাওয়াইয়ার প্রচলিত ধারার গানগুলোতে সুর ও কথার ঔজ্জ্বল্য রয়েছে। প্রচলিত গানগুলো দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তা পেলেও শিক্ষিত গীতিকারদের অবদান কম নয়। সেক্ষেত্রে রচয়িতা হিসেবে নুরুল ইসলাম জাহিদের বিশেষ কৃতিত্ব রয়েছে। শব্দ ও সুরের নির্বাচনে তার পারদর্শিতা অনস্বীকার্য। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত সংসারের টানাপোড়েন ও অসঙ্গতিগুলো সহজেই উঠে এসেছে তার গানে। তবে যে বিশেষ অঞ্চলিক শব্দের বহুল ব্যবহার অনেক সময় এই ধারার গানকে দুর্বোধ্য করে তোলে-সেসব শব্দের ব্যবহার নিতান্তই কম। শ্রোতাকে আকৃষ্ট করে তার কথার সারল্য। সরল বাণী বিন্যাসের মধ্য দিয়েই বিভিন্ন পেশার মানুষ যেমন-মাঠের চাষী, গাড়িয়াল বন্ধু, নারীর প্রেম ও দীর্ঘশ্বাস তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। তার গানের কথায় আছে-
“এই যে ইট বিছিয়া বান্ধিছে ঘাটা
গরুর গাড়ীত মটরের চাকা
হিড় হিড় করিয়া কি সুন্দর দৌড়ায়
বাহে দারুন আরাম হইছে এলা আরো গাড়িয়ালী ব্যবসায়।”
ভাষার সারল্যে জীবনের পরিবর্তনের কথা সহজেই অনুমেয়। কাঁচা রাস্তা থেকে ‘ইট বিছানো রাস্তা’ কিংবা কাঠের চাকার পরিবর্তে টায়ারের চাকা লাগানো-এই অনিবার্য রূপান্তর চিত্রায়নে গীতিকার নুরুল ইসলাম জাহিদ আপন দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার রচনায় ভিন্নতর আস্বাদ মেলে-যেমন একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, পহেলা বৈশাখ প্রভৃতি বিষয়ভিত্তিক গানে। ইতিহাস ঐতিহ্যেও তথ্যনিষ্ঠ চিত্র পাওয়া যায় এসব রচনায়। যেমন-ভাষা শহীদদের নিয়ে লিখেছেন-
“অ আ ই ঈ ক খ গ ঘ ঙ
রক্তে লেখা আছে ইহা
মিশবেনা কখনো
তোমরা জানো কিনা জানো
না জানিলে জগতবাসী
শোনো বলি শোনো ॥
পাগলের পাগলামী নিয়া পাগল আইলো দেশে
মায়ের ভাষা ছাড়তে বলে ভাল মানুষের বেশে
দেশবাসী দিল বাধা পাগলের কথায়
তাইনা শুনে মোদের বুকে বন্দুক চালায়
ও মরি হায়রে হায় আমার কইতে দুঃখ হয়
দেশবাসীর রক্তে দেশে নদী বইয়া যায় ॥”
আমাদের বিজয় দিবসকে নিয়েও অসাধারণ কিছু গান লিখেছন। তার একটির কথা এমন-‘বিজয়ের দিনতে আইসো সবাই মিলি ধরি গান/পর আপন ভুলিয়া আইসো একসাথে গাই বিজয়ের গান ॥”
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নুরুল ইসলাম জাহিদের লেখা ও গাওয়া অনেক গান শুনেছি রংপুর বেতার থেকে। যেমন-“জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বাংলার নয়ন মণি/ভুলি নাই ভুলিবনা ভাই/আমরা তার মুখের বাণী ॥”
বৈশাখে শুনেছি- “এ বছর যেন সুখে থাকি রে/শোন শোন দয়াময়/ওরে হাসিয়া খেলিয়া যেন মোর দেশবাসী কাটায় ॥”
কিংবা “আইজ আইলোরে বছর ঘুরি বৈশাখের পৈলা দিন/ওরে নাচো আর গান গাও/তালে তালে ঢোল বাজাও তাক্ ধিনা ধিন্ ধিন তাক্ তাক্/তাক্ ধিনা ধিন্ ধিন ॥”
তার নবান্নের লেখা গানেরও জুরি নেই। যেমন-“কয়সার আলো চাউল পাড়িয়ে সোনা মোর বানিয়ে করো আটা/কাইল বিয়ানে বানেয়া দেন মোক গামলা কয়েক পিঠা/ওকি হায়রে হায়, মনটায় মোর পিঠা খাবার চায় ॥”
এই গানটিসহ তিনটি গান শাহনেওয়াজ কাকলী পরিচালিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘উত্তরের সুর’-এ ব্যবহৃত হয়েছে। নাটকেও বেশ কয়েকটি গান ব্যবহৃত হয়েছে।
কালা, গাড়িয়াল কিংবা গাড়িয়াল বন্ধুর প্রেম বিরহের একঘেয়েমি ছক বাঁধা গান থেকে এসব গান ভিন্ন স্বাদের। যা ভাওয়াইয়ার পরিধিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। লোকসংস্কৃতির ভান্ডারকে করেছেন সমৃদ্ধ। এসব বিষয়ে গুরুজীর সাথে বহুবার কথা বলতে গিয়ে জেনেছি। তাছাড়া বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ও বেতারে দেয়া সাক্ষাতকার শুনে জেনেছি যে, এই একঘেয়েমি ছক তথা বৃত্ত ভাঙতে গিয়েই গীতিকার হিসেবে তাকে অনেক বিতর্কের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
তিনি প্রথম রংপুর বেতারে ঈদ, পূজা, নবান্ন, পিঠা, বৈশাখসহ বিশেষ দিনগুলো নিয়ে ভাওয়াইয়া রচনা করেন এবং তা সুর দিয়ে বেতারে পরিবেশন করেন। শিল্পী, সুরকার ও গীতকার পরিচয়ের পাশপাশি তিনি লোকগানের একজন নিবিষ্ট গবেষক। ঐতিহ্য ও লোকসংগীত বিষয়ে তার লেখাও কম নয়। বিভিন্ন পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাতকার এবং ‘গ্রাম বাংলার চিরায়ত সংগীত-পল্লীগীতি’, ‘কুড়িগ্রাম হামার জেলা বাহে’ প্রভৃতি লেখায় পল্লীজীবন ও পল্লীগানের নিষ্ঠাবান গবেষক সত্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
আশির দশকে রংপুর বেতার কর্তৃপক্ষের আয়োজনে ‘ভাওয়াইয়া গানের সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও উত্তরণ’ শীর্ষক বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় ভাওয়াইয়ার একজন গবেষক হিসেবে নিজের লেখা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তার এই বক্তব্যে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথেই বলতে পেরেছিলেন-গীতিকারদের চৌর্যবৃত্তির কথা ও সুরকারদের সুর বিকৃতির কথা। প্রচলিত গানের দু’একটি কলি পরিবর্তন করে, পুরনো গানের ছাঁচে ফেলে গীতকার সাজার অপচেষ্টার কথা অকপটে তুলে ধরেন। কম পারিশ্রমিকের কারণে শিল্পী ও গীতিকারের গভীর পরিচর্চা পাওয়া অসম্ভব। ওইদিন আরও অনেক যৌক্তিক দাবি তুলে ধরেছিলেন প্রাণের গান ভাওয়াইয়াকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠার তাগিদ থেকেই। তার দেয়া প্রতিটি দাবি ও অভিযোগ আজও প্রাসঙ্গিক। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি-নুরুল ইসলাম জাহিদের কোনো দাবি তথা অভিযোগ রংপুর বেতার কর্তৃপক্ষ আজও খতিয়ে দেখেনি কিংবা কোন দাবি সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বিভিন্ন সময় গুরুজীর মুখ থেকে অনেক অভিমানের কথা শুনেছি। ভাওয়াইয়া নিয়ে তার নিজের কর্মপরিকল্পনা ও বেতার কর্তৃপক্ষের উদীসনতার কথাও শুনেছি। সেসব কথা বলে শেষ করা যাবে না। তবে এইটুকু বলতে চাই, ২০১৩ গুরুজী যখন খুবই অসুস্থ, তখন আমি ব্যক্তিগতভাবে রংপুর বেতার কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেছিলাম। জানতে চেয়েছিলাম-তার সাড়ে ৩ হাজার গানের মধ্যে কতগুলো গান বেতারে সংরক্ষিত আছে। কর্তৃপক্ষ প্রথমে বলে অনেক গান আছে, পরে খোঁজ করে অনেক কষ্টে মাত্র পাওয়া গেলো ৩৫টি গান। ওইদিন আঞ্চলিক পরিচালকের সামনে শুধুই কেঁদেছি। বলার ভাষা ছিলো না। শুধুই দীর্ঘশ্বাস আর হাহাকার ছাড়া আর বলার কিবা থাকতে পারে। অথচ গুরুজীর শতাধিক গান আমার অন্তরেই গেঁথে আছে। তার ৫শ’র অধিক ভাওয়াইয়া গান আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে। তার বড় ছেলে সজীবের সংগ্রহেও ২ হাজারের অধিক গানের কথা আছে, কিন্তু সমস্যা হলো সুরগুলো তো ধারণ করা নেই। যে বেতারে থাকার কথা সেই বেতারে তো নেই। হায় বেতার ! হায় দেশ!
বড় অভিমানী আর প্রচারবিমুখ এই গুণী মানুষটি ভাওয়াইয়া তথা লোকসঙ্গীতের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করে গেছেন। আমরা তার মূল্যায়ন করতে পারিনি। গুণীর কদর করতে সত্যিই আমরা ভুলে গেছি।
দুরারোগ্য ব্যাধিতে (এমএনডি) নুরুল ইসলাম জাহিদ যখন খুবই কাতর, যখন তিনি আর গাইতে পারছিলেন না, তার অন্তর যখন অক্ষমতার আগুনে পুড়ে যাচ্ছিলো-তখন সত্যিকার অর্থে আমরা কেউই পাশে দাঁড়াতে পারিনি। তবুও তার নগণ্য এক ছাত্র হিসেবে তার চোখের ভাষা বুঝতে চেষ্টা করেছিলাম সেদিন। তার সারা চোখেমুখে এক অকল্পনীয় অসহায়ত্ব লক্ষ্য করেছিলাম। ‘ভাওয়াইয়া’ গানের দল-এর উদ্যোগে যতটুকু সম্ভব চিকিৎসা সহায়তায় পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছিল যে, গুরুজীর চিকিৎসা সহায়তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একটি আবেদন করেছিলাম-সেদিন প্রধানমন্ত্রীও চিকিৎসা সহায়তা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে কুড়িগ্রামের সাংবাদিক সফি খান, রাশেদুজ্জামান বাবু, খ ম সম্রাটসহ আরও কয়েকজন সংস্কৃতিকর্মী এগিয়ে এসেছিলেন। দেশের বাইরে থেকে চিকিৎসা করিয়ে আনা হয়। তবু আমরা গুণী এই মানুষটিকে ধরে রাখতে পারিনি। ২০১৫ ইং সালের ১ লা এপ্রিল আমাদেরকে চোখের জলে ভাসিয়ে দিয়ে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
উনি যে নেই তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। আমার ওপরের ছাতাটি আজ নেই, এটা বড় বেশি কষ্ট। যখন বেতার-টিভিতে গুরুজীর লেখা ও সুরারোপিত গানগুলো পরিবেশন করি-তখন অন্তর জুড়ে কতটা হাহাকার তা শুধু আমিই বুঝতে পারি। আমরা কি নুরুল ইসলাম জাহিদের মতো গুণীদের হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাস নিয়েই বেঁচে থাকবো। যে মানুষটি দেশের জন্য, মানুষের জন্য পুরো জীবনটা কাটিয়ে দিলেন; এককথায় নিঃশেষ করে দিলেন তার জন্য এই দেশ, এই সমাজের কি কিছু করার নেই? নুরুল ইসলাম জাহিদ ছাড়া তার পুরো পরিবারটি এখন বিধ্বস্ত। আকুল শ্রোতা ও ভক্তকুল।
গুরুজীর প্রথম প্রয়াণ দিবসে আমাদের প্রথম দাবি- রংপুর বেতারে রেকর্ডকৃত সাড়ে ৩ হাজার গানের অধিকাংশকে নষ্ট করলো তা খুঁজে বের করা হোক। দ্বিতীয়ত: জীবদ্দশায় না পেলেও এখন মরণোত্তর ‘একুশে পদক’ দেওয়া হোক। তৃতীয়ত: আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে অন্যান্য কৃতিসন্তাদের মতো নুরুল ইসলাম জাহিদের ছবিও রংপুর বেতার কেন্দ্রে ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, ঢাকায় সংরক্ষণ তথা দেওয়ালে ঝুলানো হোক। চতুথর্ত: বাংলা একাডেমীর মাধ্যমে তার সাড়ে তিন হাজার গানের পান্ডুলিপি কয়েক খন্ডে বই আকারে প্রকাশ করা হোক। জানিনা, আমাদের এই দাবিগুলো বেতার তথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কানে পৌঁছবে কি না।
তবে গুরুজীর লেখা একটা পল্লীগীতি গানের কথা দিয়ে শেষ করতে চাই। ‘ও সে ভুলেই বুঝি গেছে আমায়/আমার কথা মনে বুঝি নাই’। সত্যিই বলছি- গুরুজী শুধু আমার একা নয়, আমাদের সবার অন্তরে বেঁচে থাকবেন। আপনার কথা মনে ছিলো, আছে, মনে থাকবেই। আপনি অনেক বড় মাপের মানুষ হয়েও আমাকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন, অনেক কাছের তথা আপনজন হয়েছিলেন। বাবা-মায়ের পর আপনাকে পেয়েছিলাম বড় আপন করে। সুখ-দুঃখে যেমন করে আপন মানুষকে খুঁজে বেড়াই; তেমনি করে আমার গুরু নুরুল ইসলাম জাহিদকে খুঁজে ফিরি-তার গানের কথায়, সুরে ও হাতের লেখায়। খুব অনুভব করি।
[লেখক : ভাওয়াইয়া শিল্পী ও সাংবাদিক, প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক ভাওয়াইয়া গানের দল ও ভাওয়াইয়া স্কুল] 




এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন

close