শিরোনাম :

প্রচ্ছদ » সম্পাদকীয়

‘পান্তা-ইলিশ’ হোক না হোক আজ পহেলা বৈশাখ

বৃহঃ, ১৪ এপ্রিল'২০১৬, ১২:২৪ অপরাহ্ন


‘পান্তা-ইলিশ’ হোক না হোক আজ পহেলা বৈশাখ  
বিগত দিনের সব না-পাওয়ার বেদনা আর হতাশা দূর করে নতুন আশা আর প্রাণের বারতা নিয়ে আবার এসেছে পহেলা বৈশাখ। নতুন স্বপ্ন, উদ্যম ও প্রত্যাশার আবাহন নিয়ে নতুন বাংলা বছর শুরু আজ বৃহস্পতিবার। স্বাগত ১৪২৩।

বৈশাখের নবপ্রাতে বাঙালির তাই কায়মনো প্রার্থনা- যা কিছু ক্লেদ- গ্লানি, যা কিছু জীর্ণ-দীর্ণ, যা কিছু জরা- সব দূর হোক বৈশাখ আবাহনে।

আজ নতুন বছরের আবাহন সংগীত আর বর্ষবরণের উৎসবে মুখরিত থাকবে বাংলার চারদিক। মাঠে-প্রান্তরে, শহর-নগরে, গ্রাম কিংবা নদীপারে বাঙালি মিলিত হবে তার সর্বজনীন অসাম্প্রদায়িক উৎসবে। কোটি প্রাণের চাঞ্চল্য আর উৎসব-মুখরতায় সুর উঠবে বাঁশির, বেজে উঠবে ঢোল-বাদ্য।

তবে উচ্ছল প্রাণময় জীবনের এই আবাহনী এবার থাকবে শৃঙ্খলের বেড়িতে। ক্যাঁ-কুঁ নাগরদোলা, সুরেলা বাঁশি কিংবা ঢাক গুড়গুড় ঢোল থামিয়ে দিতে হবে বিকেল পাঁচটার মধ্যে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনে এই বিধান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। পাঁচটার পর খোলা হাওয়ার আনন্দ আবাহন আর বৈশাখের নৈবেদ্য নিয়ে যেতে হবে অন্দরে। তখন গমগম করে উঠবে মিলনায়তনগুলো, বৈশাখী সুর প্রতিধ্বনিত হবে হোটেল-রেস্টুরেন্ট, ক্লাব ও বাড়িতে বাড়িতে।

প্রতিবারের মতো আজ নতুন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাবে রাজধানী ঢাকার দৃশ্যপট। শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলায় বর্ণবহুল হয়ে উঠবে নগরী। বরাবরের মতোই ভোর সোয়া ছয়টায় রমনার বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতী অনুষ্ঠানে ভোরের সুর তুলে শুরু হবে বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা।

এর সঙ্গে সঙ্গেই রমনার বটমূল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, ধানমন্ডির লেকের পাড়, সংসদ ভবনসহ শেরেবাংলা নগর,  বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, গুলশান, বনানী,  উত্তরা, মিরপুর, যাত্রাবাড়ি এক কথায় পুরো রাজধানীই বৈশাখী উৎসবে মেতে উঠবে। কাকডাকা ভোর থেকে নগরীর পথে ঢল নামবে শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীসহ নানা বয়সী মানুষের। তাদের পরনে থাকবে লাল-সাদার পাশাপাশি বাহারি রঙের নকশাদার পোশাক।

মেলা বসবে পার্কে কিংবা কোনো খোলা জায়গায়। নানা গ্রামীণ পসরা নিয়ে বসবে দোকানিরা। বাবা কিংবা কাকা-মামার কাঁধে চড়ে শিশুটি কিনবে ঢুগঢুগি কিংবা  হাতি-ঘোড়া খেলনা। কিশোরী-তরুণীরা লাল চুড়িতে ভরবে হাত।

বছরের প্রথম দিনটিতে বাসাবাড়িতে তৈরি হবে বাঙালি খাবার- শুঁটকি-বেগুন-ডাল-আলু-কালিজিরাসহ নানা পদের ভর্তা। আবার অনেকের ঘরে রান্না হবে সর্ষে ইলিশ। সঙ্গে পান্তাভাত।

নগরীর অভিজাত রেস্টুরেন্টগুলো এবং রমনা ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আশপাশে ভ্রাম্যমাণ রেস্টুরেন্টেও থাকবে পান্তা-ইলিশের আয়োজন।

তবে ইলিশকে বৈশাখের খাদ্যতালিকায় না রাখতে বিভিন্ন মহল থেকে আছে আহ্বান। এমনকি প্রধানমন্ত্রীও ঘোষণা দিয়েছেন, এদিন তার পাতে থাকবে না ইলিশ। কারণ এ সময়টি ইলিশের প্রজননকাল। ফলে এবার ‘পান্তা-ইলিশ’ অনেকটা নিরুৎসাহিত হচ্ছে।

তবে পান্তার সঙ্গে ইলিশ থাকুক আর না-ই থাকুক, আজ পহেলা বৈশাখ, বাঙালির প্রাণের উৎসব। জাতি- ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে আনন্দ আয়োজনে মিলবে সবাই।

আজ কেবল বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর যেখানেই বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষী মানুষ রয়েছে, সেখানেই বর্ণাঢ্য উৎসবের পালিত হবে পহেলা বৈশাখ।

বাংলাদেশের পার্বত্য জেলার আদিবাসী সম্প্রদায় প্রতিবছরের মতো পুরনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করে অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে।

নববর্ষ উপলক্ষে কাল সরকারি ছুটির দিন। জাতীয় সংবাদপত্রগুলোতে থাকছে বাংলা নববর্ষের বিশেষ দিক তুলে ধরে ক্রোড়পত্র। সরকারি ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলে রয়েছে নববর্ষকে ঘিরে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা।

বিদায় ১৪২২ সন। স্বাগত ১৪২৩। ইউরোবিডি পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা, শুভানুধ্যায়ীসহ সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা।

রাজধানীতে নববর্ষের মূল অনুষ্ঠান

বর্ষবরণে রাজধানী জুড়ে আজ থাকবে নানা আয়োজন। তবে প্রধান দুটি অনুষ্ঠান থাকবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রমনার বটমূলে।

ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ছায়ানট দিনের প্রথম প্রভাতে ভোর সোয়া ছয়টায় রমনার বটমূলে শুরু করবে বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা।

সূর্যোদয়ের সময়টাতে তারা গানে গানে বরণ করে নেবে নতুন বছরকে। এরপর ছায়ানটের দুই ঘণ্টার আয়োজনে রবীন্দ্রসংগীত ছাড়াও নজরুল, লালন, সলিল চৌধুরী ও রশিদউদ্দীনের গানের একক ও সম্মেলক পরিবেশনার পাশাপাশি থাকবে পাঠ ও আবৃত্তি। সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত গাওয়ার মাধ্যমে শেষ হবে এ আয়োজন।

সকাল আটটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে বের হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। এর উদ্বোধন করবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। চারুকলার সামনে থেকে বের হয়ে ইন্টারকন্টিনেন্টাল (সাবেক রূপসী বাংলা) হোটেল চত্বর ঘুরে আবার চারুকলার সামনে গিয়ে শেষ হবে শোভাযাত্রা।

এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য ‘অন্তর মম বিকশিত কর অন্তরতর হে’।

নিরাপত্তাব্যবস্থা

এবারের পহেলা বৈশাখ উৎসব নির্বিঘ্ন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে। বেঁধে দিয়েছে সময়।

গত বছর পহেলা বৈশাখে টিএসসি এলাকায় নারী লাঞ্ছনার ঘটনারি পরিপ্রেক্ষিতে এবার এই কঠোরতা অবলম্বন করা হচ্ছে।

বাঙালির এই প্রাণের উৎসবকে ঘিরে রমনা পার্কসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুরোটাই ঢেকে দেয়া হয়েছে নিরাপত্তা চাদরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, রমনা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ ঢাকার আকাশে হেলিকপ্টারে টহল দেবে র‌্যাব। এ ছাড়া পুলিশ ও গোয়েন্দারা থাকবে বিভিন্ন স্পটে।

শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, এ উপলক্ষে সারা দেশেই নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থা ও তাদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যৌথভাবে কাজ করছে সব সংস্থা।

সার্বিক নিরাপত্তা ও নজরদারি নিশ্চিত করতে বসানো হয়েছে কন্ট্রোল রুম, অবজারভেশন পোস্ট ও চেকপোস্ট। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি থাকছে গোয়েন্দা দলের সদস্য, বোমা ডিসপোজাল টিম ও মেডিক্যাল টিম।

বৈশাখের ইতিহাস

হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বারোটি মাস অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হতো গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরল, মণিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়– এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। একসময় এমনটি ছিল না। তখন বাংলা শুভ নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। প্রাযুক্তিক প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়ায় কৃষকদের ঋতুর ওপরই নির্ভর করতে হতো।

ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সঙ্গে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদের খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করতে হতো। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মোগল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন।

সম্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন,  পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।

তবে বাংলাদেশ জন্মের আগে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পূর্বপাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পাকিস্তান সরকারের এই অন্যায় আচরণের জবাব দিতেই ‘ছায়ানট’ ১৯৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল ১ বৈশাখ, বাংলা ১৩৭২ সন রমনার বটমূলে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গানটি দিয়ে সর্বপ্রথম যাত্রা শুরু করে। পরে ১৯৭২ সালে বাংলা ১৩৭৯ সন ‘পহেলা বৈশাখ’ বাংলাদেশের জাতীয় পার্বণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। 




এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন

close