শিরোনাম :

প্রচ্ছদ » সাহিত্য

তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি

শনি, ১৬ এপ্রিল'২০১৬, ১:০৯ অপরাহ্ন


তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি  
বাংলা কবিতা তথা ভাষার প্রশ্নে ছন্দ বা ছন্দহীনতার স্বরূপ নিয়ে প্রিয় পাঠকদের জন্য কবি হিজল জোবায়ের লিখেছেন গদ্য ‘ছন্দ মূলত ভাষা, ভাষা আদতে ভাব’।
 
ছন্দ মূলত ভাষা, ভাষা আদতে ভাব
হিজল জোবায়ের
‘‘***উঠিলা রাক্ষসপতি প্রাসাদ-শিখরে,
কনক-উদয়াচলে দিনমণি যেন
অংশুমালী। চারিদিকে শোভিল কাঞ্চন-
সৌধ-কিরীটিনী লঙ্কা— মনোহরা পুরী!
হেমহর্ম্য সারি সারি পুষ্পবন মাঝে;
কমল-আলয় সরঃ; উৎস রজঃ-ছটা;
তরুরাজি; ফুলকুল— চক্ষু-বিনোদন,
যুবতীযৌবন যথা; হীরাচূড়াশিরঃ
দেবগৃহ; নানা রাগে রঞ্জিত বিপণি,
বিবিধ রতনপূর্ণ; এ জগৎ যেন
আনিয়া বিবিধ ধন, পূজার বিধানে,
রেখেছে, রে চারুলঙ্কে, তোর পদতলে,
জগত-বাসনা তুই, সুখের সদন।***’’
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
(মেঘনাদবধ কাব্য)
ছন্দ ছাড়া কবিতা সম্ভব না। এক বাক্যে এমন কথা বলে ফেলা যায় সম্ভবত তখনই, ছন্দ শব্দটিকে যখন আক্ষরিক অর্থের বাইরে একটা বড় পরিসর থেকে দেখা যায়। ছন্দ আর আপাত ছন্দোহীনতার ক্রমক্ষীয়মাণ এক বিচ্ছেদ মুহূর্ত আছে, সেই মুহূর্ত থেকে আপাত ছন্দোহীনতায় (গদ্যে) ভর করে ভাষার আরেক চলন বের হয়ে আসে। যাকে আমরা গদ্যরীতি জানি। এটা ভুঁইফোঁড় বা বায়ুভূত কিছু নয়। বাংলা কবিতার ঐতিহাসিক যাত্রাপথেই এই রূপগুলিকে নানা মাত্রায় পাওয়া যাবে। মধ্যযুগ থেকে, মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, তিরিশ হয়ে এ প্রবহমান। একাডেমিক ছন্দকে ভেঙে আরেক ছন্দ নির্মাণ করা তারও একটা একাডেমিক, তথা শৃঙ্খলাময় আর বিশ্লেষণী পদ্ধতি থাকে, ফলে ভাঙন নিজে হয়ে ওঠে আবার একাডেমির আওতাভুক্ত। একাডেমি এখানে গঠনমূলক'র প্রতিশব্দ। ছন্দের, বাক্যবুননের, ভাষার গমনভঙ্গির এই ভাঙাগড়ায় তৎকালীন একাডেমিক ছন্দের বাইরে যখন কবিতাকে গদ্য-রীতির দিকে ধাবিত করবার চেষ্টা হচ্ছিল, খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও করছিলেন চেষ্টা, আর সেই চেষ্টার ফল হিসেবে যে গদ্যরীতি দাঁড়ালো শেষমেশ, সেটা নিয়ে শঙ্খ ঘোষকে প্রত্যাশিত আনন্দ প্রকাশের বাইরে, কিছুটা আপত্তিও করতে দেখা যায় পরবর্তীতে। কথা সাহিত্যের গদ্যরীতির বাইরে, কবিতায় গদ্যরীতির ক্ষেত্রে যে আরও অনেক সংহত একটা রূপ কবিদের দ্বারা দাঁড়াতে পারতো এটা যেন সেই বস্তু নয়। এই বিষয় বিস্তারিত আলাপের দাবি রাখে। সেটার জন্য অন্যভাবে আলাপ পাড়তে হবে। শুধু সূত্রটির উল্লেখ থাকল এখানে। কবিতায় ছন্দ, গদ্য, ছন্দের বাইরে- সেই বিশেষ মিলন কিংবা বিচ্ছেদের রূপটি না দেখে উঠলে আপাত ছন্দোহীনতা কিংবা গদ্য-স্বরূপ কিছুই বুঝে ওঠা যায় না। বুঝে ওঠা যায় না যে ছন্দ কেন ছন্দ, আর ছন্দোহীনতা বলতে যা বুঝি তা আদতে আরেক ছন্দ কি না। একাডেমিক ছন্দের সাথে এর সম্পর্ক কী, কোথায়?
ছন্দ কেবলমাত্র- ছন্দ, অক্ষর, মাত্রা, পর্ব এইসব শব্দের কারণে গুরুত্বপূর্ণ না। ছন্দের নামে মূলত ভাষার চাল, চলন, সেই চলনভঙ্গী ছেঁকে বের করে আনা সিনট্যাক্সের ভিতর দিয়েই ভাব বা চিন্তা ধারণ, সুরের বুনন;  চিন্তাকে নিজ ভাষায় অভিযোজন এইসবেরই চর্চা। ভাব আর ভাষা সেইখানে একই বস্তু। ছন্দ ফলে ভাষার সাথেই যুক্ত, একে বুঝলে ভাষাকে বুঝতে সুবিধা হয়। কবিতা লিখতে অনুবাদ ভাষার দ্বারস্থ হতে হয় না। এই প্রসঙ্গে অনুবাদ ভাষা বিষয়ে যা বলবার, বাংলা বর্ণে ভাষা লিখলেই তা বাংলা ভাষা হয় না, ঠিক যেভাবে ভার্চুয়াল জগতে হরহামেশাই আমরা ইংরেজি বর্ণে বাংলা লিখি সেটা শেষমেশ বাংলা ভাষাই, ইংরেজি বর্ণে লিখলেও তা ইংরেজি ভাষা নয়। বাংলা কবিতায় চর্চিত ভাষা, বাক্যগঠন প্রণালির ভিতরে তাকালে, বিশেষ করে ষাটের দশক থেকে দেখা যায় বিদেশী কবিতা অনুবাদ করলে যে ভাষাকাঠামো তৈরি হয় সেই অনুবাদের ভাষা কাঠামো যা বাংলা ভাষার চলনের সাথে, সুর ও ভাবের সাথে যায় না, সেই ভাষায় এন্তার কবিতা লেখা হচ্ছে। এই যে অনুবাদের ভাষা, এই ভাষার বাক্যগঠন প্রণালির কারণেই লেখকের চিন্তা-পদ্ধতি অন্যভাবে পরিচালিত হয়। বাক্যের চলন এভাবে ভাব ও চিন্তারীতিকে, সুরকে এক বিশেষ মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ করে। এই অনুবাদের ভাষা সেভাবেই স্বাভাবিক কারণেই লেখকদের নিজ জনগোষ্ঠী, নিজ বাস্তবতা, নিজস্ব চিন্তা ও কল্পনার সততার জায়গা থেকে কেবলই এক অপর, কল্পিত অমূলক বাস্তবতায় নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে। আর বলাবাহুল্য সেই বাস্তবতা পশ্চিমের বাস্তবতা। কসমোপলিটন নাগরিকতার নামে- নিজ জনগোষ্ঠী, ভূগোল এই শব্দগুলিকে হালকা করে নেবার সুযোগ নেই। মানব-অস্তিত্বের প্রশ্নে যেমন এগুলো বড় নিয়ামক, একইভাবে চলমান বৈশ্বিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এগুলো তাই।
ভিন্ন স্বাদ দেবার প্রয়োজনে কখনো হয়তোবা দুয়েকজন শিল্পীর ক্ষেত্রে অনুবাদ ভাষারীতির এমন ব্যতিক্রমকে স্বাগত জানানো যায়। কিন্তু তার বদলে যখন একটা বড় অংশই এই চর্চাকে বার-বার অনুকরণ করতে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেটা একটি ভাষার দেউলিয়াত্বই প্রমাণ করে। ছন্দ এইখানে প্রাসঙ্গিক নিজ ভাষারীতির চলনকে আত্মস্থ করতে। শুধু তাই নয়, মানুষের নীরব পঠনের সময়ও মানুষ মূলত উচ্চারণ করেই পাঠ করে, পাঠকের ভেতরে থাকে এক বাকযন্ত্র ও শ্রুতিযন্ত্র; পাঠের সময় তা নানানরকম গতি ও সুরে পাঠ করে। অনুবাদ ভাষা বা চলমান গদ্যভাষা চর্চাকারী বেশিরভাগ-ই ছন্দ ও গদ্যের পাসস্পরিক সূত্র ওভারলুক করে গেছে যারা, সুরের ভেরিয়েশন নিয়ে যারা উদাসীন, লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে তাদের টেক্সট সুরের, গতির একঘেয়েমিতে আক্রান্ত। কারণ পাঠকের অন্তর্গত বাক ও শ্রুতিযন্ত্র তাদের টেক্সট একই টোনাল স্টেট থেকে পাঠ করে। একই টোন, একইরকম গতি সবসময়ই একইরকম চিন্তা-পদ্ধতিকে প্ররোচিত করে। ফলে লেখক বেশিরভাগ সময়ই নিজেরই অজান্তে, অক্ষমতায় কখনোবা একই বাক্যরীতি, একঘেয়ে সুর, একই কল্পনার জগত, একই চিন্তারীতির মধ্যে ঘুরপাক খায়। তাদের লেখায় বৈচিত্র্য আনা দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। কষ্টেসৃষ্টে গদ্যে হয়তো একটা বিশেষ টোন, একটা সিগনেচার লেখক দাঁড় করায়, বেশিরভাগই তাও পারে না, কিন্তু পারলেও পরবর্তীতে সেই একই বাক্য-বুনন, একই টেক্সারেই তাকে ঘুরে মরতে হয়। কিন্তু আমরা বৃহৎ পরিসরের যে ছন্দের প্রসঙ্গে কথা বলছিলাম, তা অজস্র সুরের কারণে, নানান মাত্রার গতির কারণে নানান বাক্যবিন্যাস তৈরি করতে সাহায্য করে এর নিজস্ব করণকৌশলের বাস্তবতার কারণেই। ফলে কল্পনার জগতেরও নানামুখী অভিক্ষেপ তৈরি হয়। একমাত্র ছন্দচর্চাকারী এই সুবিধাটির কথা জেনে থাকবেন।
ভাষাই অস্তিত্ব, মানুষের কাণ্ডজ্ঞান খাটালেই তা বুঝে ওঠা যায়, এরপরেও দর্শনশাস্ত্র, ভাষাবিজ্ঞান তো রইলই তাতে ভোট দেবার জন্য।    
ছন্দের, একেবারে একাডেমিক ছন্দেরও প্রয়োজন আছে বিশেষ বিশেষ সময়ে। স্বভাবশিল্পীর বিষয়ে আমার আস্থা নাই। কিংবা নাজেল হবার বিষয়ে। যদিও সকলেই নিজের ব্যাপারে এক অপার অসীম অলৌকিক মনোনয়নের আত্ম-বিশ্বাসে ভোগে, আর নিজেকে ভাবতে থাকে সে মহাজগতে ইউনিক; এক দ্রষ্টা! এই ভাবনা আত্মঘাতী। এই ভাবনা শিল্পীকে স্টেরিওটাইপ ভাবনার অংশ করে তোলে। সবকিছুর ব্যাপারেই তার দৃষ্টিভঙ্গি হয় ওভারসিমপ্লিফাইড একটা স্টেরিওটাইপ। এই ভাবনা ন্যায্য ও সহনশীল আত্ম-বিশ্বাসের বাইরে শিল্পীকে ফেসিস্ট করে তোলে।
দুই একজন শিল্পীর ক্ষেত্রে তা কাজেও দেয় অজস্র পারমুটেশন কম্বিনেশনের কোনো এক সম্ভাব্য সমীকরণের ফাঁকে, তা নিদর্শন হতে পারে না। কিন্তু, সেই ফাঁক গলে জগতে সকলেই যখন নিজেকে একইভাবে ভাবতে থাকে তখন তৈরি হয় এক সীমাহীন নৈরাজ্য !শিল্পী আর শিল্পমোদীর ফারাক উবে যায়, যদিও জগতে সিংহভাগই শিল্পমোদী। ফলে অ্যানারকি নয়, ডিসিপ্লিন থেকে বের হয়ে আসুক নিয়ন্ত্রিত নৈরাজ্য। যুগে যুগে তাই হয়েছে। ডিসিপ্লিন ইজ মাস্ট। চলমান বাংলা কবিতার বাস্তবতায় ছন্দ সেই প্রয়োজনীয়তার কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। সঙ্গীতে আমরা দেখতে পাই, একজন তবলা কিংবা মন্দিরা বাদক, বা অন্য যে কোনো যন্ত্রী তার যন্ত্র বাজাবার আগে যন্ত্রটিকে চুমু খাচ্ছে, সালাম ঠুকছে, এই যে মিনিমাম রেস্পেক্ট- ভাষার চর্চাকারীকেও ভাষার প্রতি এই রেস্পেক্ট রাখা জরুরি। ভাষা, কবিতার প্রশ্নে ছন্দ সেখানে ন্যায্য দাবিদার।
কাপালিকের নৈরাজ্য, র‌্যাবো কিংবা বোদলেয়ার'র আপাত নৈরাজ্য এক শৃঙ্খলিত নৈরাজ্যই। এটা শুধু মনে মনে মন কলা খাবার আনন্দে গড্ডালিকায় ভাসা কোনো নৈরাজ্য নয়। দ্রষ্টা হয়ে ওঠা বা ভাবতে থাকারও একটা পয়েন্ট অব ভিউ থাকে জীবনাচরণে, লেখায়, কথায় তার আভাসও থাকে, থাকে আলাদারকম সাধনা। সবাই দ্রষ্টা হয় না, আর দ্রষ্টা হয়ে ওঠারও অনেক লক্ষণচিহ্ন থাকে। ফলে, অন্ধ-আত্মপ্রেম, যা মূলত আত্ম-প্রবঞ্চনা তার থেকে বেরিয়ে এসে শিল্পীকে মূল দিতে হবে মাটিতেই, এরপরে শাখা, প্রশাখা কোন বিন্যাসে, কত উচ্চতায় বিন্যস্ত হবে, সেই ক্ষমতা শিল্পীর। তার আগে নিজেকে একটু পলকা ভাবতে শেখা প্রয়োজন। জানুন যে আপনি সামান্য, পঁচা ও অকেজো। এই ভাবনা আপনাকে গুটিয়ে কেন্দ্রবিন্দুর কাছে নিবে, নিজের অস্তিত্বকে বেড় দেওয়া এক বিন্দুবৎ ছোট বৃত্তের মধ্যে সমাহিত করবে। এই সঙ্কোচন থেকে সংগ্রহ করুন উৎকেন্দ্রিকতার শক্তি, তারপর বেরিয়ে আসুন বাইরে। বড় বড় উচ্চতার পাশে নিজেকে নিম্নমুখী করে রাখুন। আর জানুন নিম্নমুখিতা আসলে উচ্চতার প্রেক্ষিতে আপনার গভীরতা। এইভাবে ছোটো হতে শিখুন। নিটশে সেই কবেই বলে গেছেন- তোমার উচ্চতাই আমার গভীরতার নির্দেশক।
অবচেতনার নাম দিয়ে, বিমূর্ততার নাম দিয়ে বাংলা কবিতায় এখন নৈরাজ্য চলমান। এই চর্চা অবচেতনা, বিমূর্ততা ব্যবহারকারি মাস্টার শিল্পী যারা এসব শুরু করেছিলেন তাদের আদর্শের বাইরেই আজ বিকৃত আদর্শে ভর দিয়ে বিরাজ করছে। এ যেন ডিনামাইট আবিষ্কারের মতন, আমরা যাকে এন্তার ভুলভাবে ব্যবহার করতে শিখেছি পরবর্তীতে নিজেদের ধ্বংসাত্মক প্রবণতার কারণে। আজকের চলমান বাস্তবতায় কবিতার প্রশ্নে আমাদেরও সেই একই অবস্থা। এর অবসান হওয়া জরুরি। এর চেয়ে গ্রীক অনুকরণবাদও অনেক ভালো বস্তু। যখন বিমূর্ততা একঘেয়ে, ফাঁকির আরেক নাম; সেই ক্রান্তিকালে আগে ঘোড়া আর মানুষের স্কেচ করা চাই, অনুবাদের ভাষায় লিখতে থাকা হে বিমূর্ততা আর মহান অবচেতনার হাঁচি কাশির সন্তানেরা... 




এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন

close