শিরোনাম :

প্রচ্ছদ » সাহিত্য

সাহিত্যচিন্তা ও মাহফুজামঙ্গলের কবি

রবি, ১৭ এপ্রিল'২০১৬, ১:২১ অপরাহ্ন


সাহিত্যচিন্তা ও মাহফুজামঙ্গলের কবি  
আজ কবি মজিদ মাহমুদের জন্মদিন। কবির ৫০ বছর পূর্তির দিনে তাঁর দুটি বই নিয়ে অালোচনা করেছেন বিলু কবির।
সাহিত্যচিন্তা ও মাহফুজামঙ্গলের কবি
ফলদ বৃক্ষ বিষয়ে ফলকথা হলো, যখন সে সফল থাকে, তাকে তখন অতটা আকাশছোঁয়া উঁচু লাগে না। কিন্তু তুলনায় অনেক বেশি উচুঁ দেখায় একটা বা যে কোনো বন্ধ্যা বৃক্ষকে। অতএব, দৃশ্যমান উচ্চতা দিয়েই সবসময় উপকারী বৃক্ষের জাতবিচার চলে না।এককালের বাঙালি সমাজ বাস্তবতায় ফল দিয়ে বৃক্ষের পরিচয় জানার প্রবাদ বা বাগধারা থাকলেও এখন সমাজ পাল্টেছে।অর্থাৎ আজকের দিনে উল্টানুরূপভাবে ফলের চারিত্র্য দেখেও বৃক্ষের খোঁজ করা লাগে। মানে সূচক ব্যবহার এবং বিকল্প বা প্রধান পদ্ধতি প্রয়োগের ধারণা অনেকটাই কিন্তু পাল্টে গেছে। এই আলোচনাটা কবি-গবেষক মজিদ মাহমুদকে নিয়ে নিতান্ত একটি অসম্পন্ন প্রয়াস। একটু ইনিয়ে-বিনিয়ে দূর বৃত্ত টেনে মুখপাত ভূমিকা করার দরকার হলো, একটা আবহ সৃষ্টি করা। বিশেষ করে তার বিষয়ে যারা ঠিক জেনে উঠতে পারেননি, বা বলা যেতে পারে যারা মজিদ মাহমুদের লেখালেখির পরিসরগুলোর সাথে অতটা পরিচিত নন, শুরুতেই তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা। যেভাবে শুরু করেছিলাম, উচুঁ বৃক্ষ আর নিচু বৃক্ষ। কিছু গাছ-প্রজাতি আছে তারা নৈসর্গিকভাবেই বামুন, আবার কিছু আছে একইভাবে উচুঁ-লম্বা। তার, একটারও উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই, এমন হাজারটা উদাহরণ যে রয়েছে সে কথা বলাই বাহুল্য। যারা মজিদ মাহমুদকে আগ-পাছ-মধ্য জানেন, তারা তার লেখাকে বলতে পারেন: ‘বৃক্ষ তোমার নাম কী- ফলে পরিচয়’। আর যাদের কাছে তিনি অপরিচিত, তারা তাকে জানার পর বলবেন: ‘ফল তোমার নাম কী, বৃক্ষে পরিচয়’। ইশারা নিশ্চয়ই অনুধাবনযোগ্য, যেহেতু পাঠকমাত্রই আকিলমান্দ।
ফল ধরা একটা উচুঁ গাছকেও দৃশ্যতঃ বেশ খানিকটা নিচু লাগে, কারণ ফলের ভারে তার ডগাগুলোকে অনেকখানি নিরুপায় অবনত হয়ে থাকতে হয়। কিন্তু যে গাছ ফল দেয় না, তার তো ফলের ভার নেই। অতএব, তার ডগাগুলোকে আকাশছোঁয়া এবং লকলকে তেজি লাগে। এই অর্থে মজিদকে মনে হতে পারে যে, তিনি আকাশছোঁয়া নন। কিন্তু অন্তরালের ব্যাপারটি ফলদ বৃক্ষ আর বন্ধ্যা বৃক্ষের মতো।
২. 
মজিদ মাহমুদকে নিয়ে লেখালেখির চিন্তা বা তাকে নিয়ে আলোচনা-মূল্যায়নের প্রশ্ন উঠলেই, এখন পর্যন্ত আমাদের যে সাহিত্য বাস্তবতা, তাতে প্রথমত এবং প্রধানত যে বিষয়টি উঠে আসে, তা হলো তার কাব্য ‘মাহফুজামঙ্গল’। যে গ্রন্থটি প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৮৯ সালে। এখন অব্দি, মানে প্রথম প্রকাশের পর বিগত ২৬ বছরে যার পাঁচটি সংস্করণ বেরিয়েছে। এমনকি মাহফুজার ‘পঁচিশ বছরের পাঠ’ মূল্যায়ক একটি সমৃদ্ধ সংকলন গ্রন্থও প্রকাশ পেয়েছে। যার প্রতিপাদ্য হিসাবে ‘মাহফুজামঙ্গল’ এবং মজিদ মাহমুদ একাকার হয়ে গেছেন। এই বইয়ে ৩৫ টি গদ্য সংকলিত হয়েছে, যার প্রতিটিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ লেখাগুলোয় বহুরৈখিক চেতনায় ভঙ্গিবৈচিত্র্যের নানামাত্রিক দৃষ্টিতে মাহফুজা এবং মজিদ বীক্ষিত হয়েছেন। সেইসব লেখার সাথে সবাইকে, কাউকে-কাউকে, এমনকি স্বয়ং মজিদ মাহমুদকেও একমত হতেই হবে বা হতে হবেই না, ব্যাপারটি সে রকম নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু যেটি অবাক হবার বিষয়, তা হলো গত পঁচিশ বছরে ‘মাহফুজামঙ্গল’ বিজ্ঞ পাঠকের হয়ে উঠেছে। এবং পরিমাপের পারদকাটায় মজিদ মাহমুদের কাব্য দক্ষতার মাহাত্ম্যটি সেখানেই। তিনি যখন মাত্র ২৪ বছরের যুবক, সেই সময় ‘মাহফুজামঙ্গল’ বেরিয়েছিল। অর্থাৎ কবিতাগুলো রচিত হয়েছিল তারও আগে। সে হিসাবে যা আন্দাজপছন্দে দুই বছর বাদ দিই, তাহলে মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি কবিতাগুলো লিখেছিলেন। আর সেই কালেরলেখা কবিতাখননে যে ‘পঁচিশ বছরের পাঠ’ বেরিয়েছে, তাতে মজিদকে সত্যিকার ছোটর চাইতে ছোট এবং বড়র চাইতে বড় করা হয়নি। করার প্রশ্ন এবং প্রয়োজন ছিল না। থাকলেও দায়িত্বশীল ও মর্যাদাসীন লেখকরা সেটা কেন লিখবেন!
আমরা যখন আড্ডা দিই, কাউকে বুঝতে কিংবা বোঝাতে বিতর্ক-বাহাস করি, তখন যদি বা তার কথা ওঠে, তাহলে লক্ষ্য করেছি মজিদ মাহমুদকে মাপতে লক্ষ্যে-অলক্ষ্যে, পরোক্ষে-প্রত্যক্ষে প্রধান কাজ হিসাবে সামনে এসে দাঁড়ায় যে গ্রন্থটি, সেটা ‘মাহফুজামঙ্গল’। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, প্রকাশিত হবার ২৫ বছরের মাথায়, যখন লেখকের আরো একাধিক কাব্য এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা বেরিয়ে গেছে, তখন আর ‘মাহফুজামঙ্গল’র মাথায় শ্রেষ্ঠত্বের শিরোস্ত্রাণটি মানায় না। কথা খুব অল্প এবং মেদ বর্জিত।
৩. 
আমি বলতে চাইছি যে, ‘মাহফুজামঙ্গল’ উচ্চমার্গীয় হলেও সর্বোচ্চ নয়। আমার মনে হয় এই কথায় মজিদ মাহমুদের পাঠক এবং স্বয়ং মজিদও দ্বিমত পোষণ করবেন এবং ক্ষুণ্ন হবেন যে, আমি ‘মাহফুজা’কে খ্যাতি বঞ্চিত করার প্রয়াস পাচ্ছি। কিন্তু ব্যাপারটি কি আদপেই তা-ই? বরং মাহফুজার মোহনীয় কাব্যলাস্যকে সমর্থন করেই আমার স্বীকারোক্তি হলো, মাহফুজাকে ডিঙিয়ে যেতেও যে মজিদ মাহমুদ সক্ষম, পরবর্তীতে সেটাও প্রমাণিত। ‘দিওয়ানই-ই  মজিদ’র হাফিজি দর্শন এবং ছান্দসিক পারঙ্গমতার কথা যদি আমলের বাইরেও রাখি, তবুও যখন অন্তত ‘বল উপাখ্যান’ (২০০১), আপেল কাহিনী (২০০২), গোষ্ঠের দিকে (১৯৯৫), শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০১০), ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম (২০০৭), কাঁটাচামচ: নির্বাচিত মজিদ মাহমুদের কবিতার (২০০৮) কাব্য পাঠকের কাছে পৌঁছে গেছে, তখন অন্তত মাহফুজার একতরফা ঔজ্জ্বল্যের স্ফুরণ অনেকটাই মিইয়ে মলিন কি হয়ে যায় নি? প্রশ্নটি হয় তো সরল, হয়তো অসরল। জানি এ ক্ষেত্রেও কথা তোলার, দ্বিমত করার অধিকার সকলেরই রয়েছে। স্বয়ং মজিদের পক্ষে হয়তো বলা কঠিন হবে যে, তার ঐ বইটি সেরা। কারণ এমনটি বলে নিজের মূল্যায়নে নিজেই উপহাসের পাত্র হওয়া যে, প্রকান্তরে নিজেরই অন্য বইকে ‘সেরা নয় বলা! শুধুমাত্র তার কাব্যগুলোকে নিয়ে যদি একটা পৃথক মাপজোখ করা যায়, তাহলে আমার বিবেচনায় সবচেয়ে বড় ফিতে লাগবে ‘নির্বাচিত কবিতা’র বপুর বেড় পরিমাপ করতে। কেননা, এটাতো কবিরই বাছাই, স্বাভাবিকভাবেই প্রতিটি কাব্য থেকে অত্যুজ্জলগুলোকে ছেকে এনেই এতে গ্রন্থনা করা হয়েছে। এবং এই মূল্যায়নটা এজন্য সহজ যে, এই কথা বলতে, এই সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে ‘নির্বাচিত’কে পাঠ করারও কোনো বাধ্যবাধক প্রয়োজনীয়তা নেই। মাঝখানে যে তার দুটো ছোট গল্পের বই রয়েছে, [মাকড়সা ও রজনীগন্ধা (১৯৮৬) এবং মেমোরিয়াল ক্লাব (২০০৬)]  সে আলোচনায় যাব কি যাবনা’র দোনোমনো অস্বীকার করবো না, কারণ এ ক্ষেত্রে আমার জ্ঞানশক্তির ঘাটতি রয়েছে। এবং তেমনটি না থাকলেও আলোচ্য গল্পগ্রন্থটি বিবেচনায় তল পেত না। কারণ সেখানে বাস্তবতাটা তো এমনটি হওয়াই সমীচীন, যেখানে এমনকি ‘মাহফুজামঙ্গল’কেই আমি ধর্তব্য মনে করতে চাইছি না। তাহলে?
৪. 
তাহলে কী আমার বলা-বক্তব্যের মূল প্রতিপাদ্য? হ্যাঁ, কবিতাও বাদ, গল্পও বাদ। এমনকি যদি শুধুই কাব্যবিচার হয়, তাহলেও অন্তত মাহফুজা বাদ অবশ্যই। প্রিয় পাঠক! আন্দাজে পণ্ডিতেরা নয়, এই আওয়াজ তুলতে নতুন করে এবং কোনোক্ষেত্রে প্রথমবারের মতো আমাকে বেশ একটা ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয়েছে। কারণ আমি জানি, যারা মজিদ মাহমুদের পাঁড়ভক্ত, তারা রে-রে করে আমার প্রতি তেড়ে আসতে পারেন। অতএব, আমাকে কিছু আটঘাট বেঁধে নিতে হয়নি ভাবছেন? তাই কখনো হয় নাকি! আমার উত্তরটা বোঝানোর জন্যই এই প্রশ্নটি করা।
বোঝাই যাচ্ছে। কবিতা গেলো, গল্পও গেলো। থাকলো প্রবন্ধ-গবেষণা। হ্যাঁ, সেখানটাতেই আমি কোন পাঠকের দৃষ্টি নিবন্ধ করতে চাইব না, জিজ্ঞাসাটা সেরকমই। এই ফাঁকে বলে রাখি, তার মূল্যবান এবং ওজনদার সব গবেষণাকর্মের বাইরে কিছু সম্পাদনার কাজ রয়েছে। সেগুলো হলো: আশির দশকের কবি ও কবিতা (১৯৯১), বৃক্ষ ভালোবাসার কবিতা (২০০০) এবং জামরুল হাসান বেগ স্মারকগ্রন্থ (২০০৪)। এগুলোকেও সেরার দৌঁড়ে বাদ রাখাই বেহেতর।
যাই হোক, সবমিলিয়ে শেষ পর্যন্ত আলোচনাটাকে যে কেন্দ্রবিন্দুতে আনার লক্ষ্য, সেটা হলো তার রচিত গবেষণাকর্ম বা মননশীল পাণ্ডিত্যজাত প্রকাশগুলো। একনজরে সেগুলোকে চাক্ষুষ করলে দেখা যাবে: নজরুল তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র (১৯৯৭), কেন কবি কেন কবি নয় (২০০২), নজরুলের মানুষধর্ম (২০০৩), রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ ও ভ্রমণসাহিত্য (২০০৬), উত্তর  উপনিবেশ সাহিত্য ও অন্যান্য বিবেচনা (২০০৯), রবীন্দ্রনাথ ও ভারতবর্ষ (২০১১), বিবিধ প্রবন্ধ (২০০৬), ভাষার আধিপত্য ও বিবিধ প্রবন্ধ (২০০৫) এবং সাহিত্যচিন্তা ও বিকল্পভাবনা (২০১২)। ও আরো বলতে ভুলে গেছি তার শিশুসাহিত্যের কথা: বৌটুবানী ফুলের দেশে (১৯৮৫) এবং বাংলাদেশের মুখ (২০০৬)। গবেষণার সব বই পড়ার অপরিহার্য আবশ্যিকতা নেই। সত্য  স্বীকার করি সবগুলো আমারও অধিত নয়। কিন্তু এগুলোর সেলফ-এক্সপ্লেইনেটরি শিরোনামের দিকে লক্ষ্য করলেই অনুধাবন করা যায় সহজেই যে, কি এগুলোর বিষয়বস্তু, কিইবা এদের ওজনগত গাম্ভীর্য। আমার আলোচনার সুবিধার্থে এই রচনার প্রতিপাদ্যকে আমি সংকুচিত আকারে আলোচ্যকে আরো চোখে আঙুল দিয়ে পিন-পয়েন্টেড করতে চাই। এবং সেটা হলো গদ্য-পদ্য, মৌলিক সম্পাদিত, গল্প, শিশুতোষ-বুড়োতোষ, নির্বাচিত-শ্রেষ্ঠ ইত্যাদির মধ্যে শ্রেষ্ঠ কাজকে চিহ্নিত করতে নামলে, অতি অবশ্যই তার মননশীল রচনাগুলোর দিকে তাকাতে হবে। নইলে মজিদ মাহমুদের ওপরে তো বটেই, তার রচনাজগতের ওপরেও অবিচার করা হবে, যা কোনোক্রমেই কাম্য হতে পারে না। আমি বিনয় এবং সংসদীয় শিষ্টা করতে ভুলছি না যে, এ একান্তই আমার মূল্যায়নপ্রসূত অভিমত। কাউকে বা সবাইকে এর সাথে একমত হতে হবে এমন দাবি আমার নয়। তবে কেউ না কেউ বা অনেকেই এই বক্তব্যের সাথে সহমত পোষণ করবেন, আকাঙ্ক্ষার এমন দৃঢ়তা আমার রয়েছে।
৫. 
আপাতত সব ছেড়ে এই আলোচনাকে আমি কেন্দ্রীভূত করতে চাই তার একটি রচনার ওপর। যা আমার নিজস্ব বিবেচনায় শ্রেষ্ঠ হোক বা নাই হোক, অন্যতম সেরা রচনা তো অবশ্যই। আর সেটা হলো ‘সাহিত্যচিন্তা ও বিকল্প ভাবনা’। ২০১২ সালে যে বইটিকে প্রকাশ করেছিল প্রকৃতি, কাঁটাবন, ঢাকা। বলবেন যে মজিদের মননশীল আরও তো কাজ রয়েছে, তার অন্য আর কোনটি না হয়ে আলোচনার জন্য কেন নির্দিষ্ট করে একেবারে এই বইটিই মনোনয়ন করা হলো? প্রশ্ন হিসাবে সেটা অগ্রাহ্যনীয় নয় বটে। কিন্তু প্রশ্নটির উত্তরও আরেকটি প্রশ্নাকারে দেখা যায়: এই বইটি নয়ইবা কেন? এখানেই আমার স্বকীয় বোধ-বিবেচনার দাসত্ব। আমার প্রতি আমিই যে এ ক্ষেত্রে অলংঘনীয় প্রভাবক, সেই সত্য স্বীকার করতে কোন কুণ্ঠা নেই। যা সত্য, তা-ই।
অবশ্যই এই কথাকে আমলের বাইরে রাখব না যে, এখানে আলোচনার জন্য ‘সাহিত্যচিন্তা ও বিকল্প ভাবনা’র বদলে রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ ও ভ্রমণসাহিত্য, রবীন্দ্রনাথ ও ভারতবর্ষ বা নজরুল তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র অথবা ভাষার আধিপত্য ও বিবিধ প্রবন্ধ অবশ্যই আসতে পারত। এতক্ষণে ইনিয়ে বিনিয়ে বিনয় করার মূল ভাষ্য হলো মজিদ মাহমুদের প্রতি আমার এক ধরনের মুগ্ধতা রয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা সমর্থন হলেও পক্ষপাতিত্ব নয়। অর্থাৎ তার বিষয়ে আমি অনেকটাই আবেগাশ্রিত হলেও মোহাবিষ্ট নই। নিশ্চয়ই ‘আহামরির’র ক্লেদ এবং অতিশয়তার মেদযুক্ত থাকার চৈতন্যহীনতা প্রয়োজনীয় সাবধানতাকে মলিন করে দেবে না। মজিদ যতখানি বড় নন, তাকে তার চেয়ে বড় করা এবং তিনি যতখানি ছোট নন, তাকে তার চেয়ে ছোট করার কোন প্রবণতা দেখিয়ে আমরা নিশ্চয়ই উপহাসের হাস্য হতে চাইব না। এবং সেটা করলেও তো কেবল বোকামিই হবে, তাতো নয়, যুগপৎভাবে তা ন্যায়-নৈতিকতার স্খলন বলে বিবেচিত হতেও বাধ্য হবে। অতএব, সেই রকম একটি অপরিণামদর্শিতার পাঁকে কে গায়ে পড়ে নিজেকে নিমজ্জমান করবে?
‘সাহিত্যচিন্তা ও বিকল্পভাবনা’ মজিদ মাহমুদের পেঙ্গুইন সাইজের একটি গ্রন্থ। দৈহিক অবয়বের দিকে দিয়ে এমন কোনো ঢাউস-ঢোলা আহামরি নয়। কিন্তু আছে না? অনেক কিছু অনেক ক্ষুদ্রকায়, কিন্তু গুণের বেলায় ধন্বন্তরি! ‘সাহিত্যচিন্তা ও বিকল্প ভাবনা’ সে রকমই একটা দর্শনধারীর আগেই গুণবিচারি। মানে কেউটেটি ছোট হতে পারে, কিন্তু তার বিষের মধু বিষ্ময়করভাবে বড়। যেসব বিকল্পভাবনা এখানে তার সাহিত্যচিন্তা ও  মনন চেতনাকে ধনাত্মকভাবে উস্কে দিয়েছে, তা হলো: গ্রন্থাগার ও সাংবাদিকতা, গ্রন্থ ও মিডিয়া, বিকল্পভাবনা: মানবজাতির টিকে থাকার লড়াই, মানবজাতির মৌলিক অর্জন ও প্রযুক্তির উৎকর্ষ, বুদ্ধিজীবি হত্যার স্বরূপ, ঢাকা কেন্দ্রিক নাগরিক সমাজ, শিল্পের দর্শন সত্যানুভূতি, ডিরোজিও এক অনন্য শিক্ষক, রবীন্দ্রনাথের পারস্য ও প্রাচ্যচিন্তা, নজরুল সাহিত্যে তারুণ্য, নজরুল: অভিশাপ ও আশীর্বাদ, জীবনানন্দ দাশ: জাতীয়তা ও আন্তর্জাতিকতা, আবু সয়ীদ আইয়ুবের চিন্তাজগৎ, মানিকের কম পঠিত দুটি উপন্যাস, রশীদ করীমের উপন্যাস: বিষয় ও শিল্পরূপ, মাহমুদুল হকের অস্তিত্ববাদী উপন্যাস, শহীদুল জহির: ভূতের গলির নির্মাতা, বিনয় মজুমদার: নিয়মে অনিয়ম, কবিতার দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে, ভাষার আধিপত্য, ভাষা ও সমাজ, বাংলা ভাষা কি বদলে যাচ্ছে, এইমে সিজায়ের ঔপনিবেশিক চিন্তার ধরন এবং ঢাকার উত্তর-উপনিবেশ সাহিত্যচিন্তা। এই হচ্ছে মজিদের ক্ষুদ্রাকায় কাজের বিস্তৃত-বিহদকায় পরিসর এবং বিষয় বৈচিত্র্য। নিশ্চয়ই এখন ভাবা সহজ হচ্ছে যে, কেন এই বই অন্যগুলোর সমান বা তুলনায় বেশি আলোচিত হবার দাবি রাখে। কেন অন্য বই নয়-এর জবাবে প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এই বইটিই নয়।
৬. 
‘সাহিত্যচিন্তা ও বিকল্প ভাবনা’র যে গদ্যগুলো গ্রন্থিত হয়েছে, সেগুলোর শিরোনাম দেখলেই মজিদের অন্তর্দৃষ্টি এবং বিষয় বীক্ষণের ব্যাপ্তি এবং গভীরতা পরিমাপ করা যায়। ব্যাপ্তিই কেবল নয়, একটির সাথে অন্যটির পৃথকীযোগ্য বৈসাদৃশ্য অবাক করার মতো। যা অতি অবশ্যই তার মনন নৈপুণ্যের প্রকৃষ্ট পরিচায়ক।
সত্যিকার অর্থেই মজিদ মাহমুদের গ্রন্থবৈভিন্ন এবং পৃথক পৃথক গ্রন্থের বিষয়বৈবিধ্য লক্ষ্য করার মতে। বিশেষ করে, ‘সাহিত্যচিন্তায় যে সকল বিকল্প ভাবনা অন্তরে-চেতনায় চিন্তার উদ্রেক করে, তার প্রায় একটিও আটপৌরে কোন বিষয়বিস্তৃত নয়। আর এই সব লক্ষ্যভুক্ত সাবজেক্টকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রভাবক ও প্রভাবিত এমনসব ইতিহাস ব্যক্তি, উদ্ধৃতি, মতবাদ, অমীমাংসা, যুক্তিতর্ক, মূলচিন্তা গ্রহণ বর্জন ইত্যাদির উপস্থিতি ঘটেছে যে, তা সবে অঙ্গীভূত হবার কারণে লক্ষ্যভুক্ত বিষয়বস্তু আরো বেশি গভীর চিন্তার আকর হিসাবে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। এইসব নানান দ্যোতনার উচ্ছ্বাসে সব আলোচনা সহায়তা গ্রহণ করতে উজ্জ্বল এবং সহায়ক হিসাবেও দ্যুতিময় রূপ পরিগ্রহ করেছে। ফলে বহুবিধ মহিমা মজিদের চিন্তা প্রকাশকে আলোকিত ও আলোড়িত করেছে। যেই আলোড়ন পাঠকের অন্তরে দোলা সৃষ্টি করতে বাধ্য অর্থে পারঙ্গম।
বিশেষ করে তার আলোচনাগুলোর খুব একটা সসারল্য ঋজু ভাষায়-ভাবে অনেক দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির অভিব্যক্তি ঘটেছে। যা কঠিন বিষয়কে যে সহজ করে দিয়েছে, সেটি হলো মজিদের পাণ্ডিত্যের কারিশমা, আবার অনেক ক্ষেত্রে যে সহজ বিষয় কঠিন হবার উপক্রম হয়েছে, বলতে দুঃখবোধ করছি যে, এ বোধহয় তার কিছু কিছু ঊনতার বা প্রাকরণিকভাবে অতল স্পর্শের অকুলতারই বহিঃপ্রকাশ। আর সব বিষয়কে পাঠকের বোধে সমান প্রাণনাসহ ধরা দেবে বা দিতে পারবেই, এমন দাবিও সবসময় করাটা সমীচীন নয়। মানে আমার বা আমাদের ঘাটতি থাকতে পারে বা আছে। তাই, সবক্ষেত্রেই যে, মজিদকে ধরতে বুঝতে পারবে এমনতো  আর কথা নয়। উদাহরণ দাঁড় করানো যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) পারস্য ও প্রাচ্যচিন্তা, তার সাথে খুব অঙ্গাঙ্গিভাবে যায় চিন্তক আবু সয়ীদ আইয়ুব (১৯০৬-১৯৮২)। সেই সাথে ‘বিকল্পভাবনা; মানবজাতির টিকে থাকার লড়াই’র এর অবলোকন সড়কে কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩)পর্যন্ত একটা পরস্পরা খুঁজে পাওয়া কঠিন হলেও সুকঠিন নয়। মানিয়ে যায় নজরুল (১৮৯৯-১৯৭৬) হয়ে জীবনানন্দ (১৮৯৯-১৯৫৪) ছুঁয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬) পর্যন্তও উজিয়ে যাওয়া। সেই নিয়ে বাঙালির কবিতা, উপন্যাস, গ্রন্থ-গ্রন্থাগার-ভাষা গণমাধ্যম। কিন্তু বেশ একটা আলটপকা উল্লম্ফনের কাঠিন্য ঘটে তখন একই গ্রন্থমধ্যে প্রযৌক্তিক উৎকর্ষের সাথে মানবজাতির মৌলিক অর্জনের মতো বিরাট বিস্তীর্ণ ক্যানভাসযুক্ত হয়। এমনকি বুদ্ধিজীবী হত্যার বিষয়-আশয়, ঢাকাইয়া নাগরিক জীবন, শিল্পদর্শন, ঔপনিবেশিক জীবন যন্ত্রণার পর্যন্ত উদ্দেশ্য মন্থন, তখন এর বিষয়ের নানামুখিতাকে রসবোধসহ পূর্ণাঙ্গ বা সম্পন্ন পাঠে মনোনিবেশী থাকতে পারার ব্যাপারটা বেশ শক্ত। কারণ ততক্ষণে রচনা প্রবাহের ধারগুলো ধীরান্তরে ধাবমান। একেবারে লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে এসেই ‘মানবজাতির মৌলিক অর্জন ও প্রযুক্তির উৎসর্গ-এর সাথে পাঠে একাকার হওয়া কঠিন, অন্তত খুব সহজ যে নয় সে কথা বোধ হয় অস্বীকার করা যায় না। মানে বলতে চাইছি যে, সূচীক্রমে পাশাপাশি রচনাগুলোর বিষয়-ঐক্য থাকলেও সবগুলোর সাথে সবগুলোকে ঠিক রিলেট করা চলে না। এ কারণেই মজিদ মাহমুদের ‘সাহিত্যচিন্তা ও বিকল্প ভাবনা’ আনন্দদায়ক পাঠ্য হলেও সহজগ্রাহ্য নয়। মজিদকে মেপে দেখার আবশ্যিকতা এবং তার উচ্চতাকে অনুমান করার সহায়ক বাস্তবতাটি সেখানেই।
৭. 
এইসব কারণেই এই লেখায় মজিদ মাহমুদ বিষয়ে যে কথা একদম শেষ বলাটা মানানসই ছিল, সেই কথাটাই এক্কেবারে শুরুতে বলে দিয়েছি। উপক্রমণিকা থাকে বলে উপসংহার, দুটোকেই যুগপৎভাবে। কিন্তু শেষে শুরু না করে শুরুতেই শেষ দিয়ে শুরু আরকি! এভাবে শেষ দিয়ে আরম্ভ করার পেছনে একটা উদ্দেশ্য ও বিষয় প্রমাণের কৌশল আছে। যাতে আলোচনার শেষটায় এসে দেখাতে পারি যে, মজিদ মাহমুদ অনেকেরই যদি দৃষ্টিসীমার নিচ দিয়ে অদেখা থেকে যান বা সে অবস্থায় যে আছেন, সেটা তার ফলভারে নুয়ে থাকা ছাড়া আর আর কোনো ঘটতি নয়। তিনি যে অফলদ নন, সেটাই তার প্রকৃষ্ট ও যৌক্তিক প্রমাণ। তিনি অফলকর বৃক্ষ হলে ভারহীন কাণ্ডে-পল্লবে তার ডগাগুলো লকলকে এবং উঁচু আকাশছোঁয়া নয়নাভিরাম দেখাত। কিন্তু সেই দৃষ্টিনন্দন দৃশ্যে কী এমন চোখশান্তি, মনোতৃপ্তি ছিল যে, গাছটি ফুলও দেয় না, ফলও দেয় না, তার কেবল পাতারই বাহার। তার চাইতে এখন পর্যন্ত একটি ফলকর বৃক্ষ হিসাবে মজিদ মাহমুদ যে রুচিসম্মত অনুচ্চতা নিয়ে, বা বলা যেতে পারে যে বাহুল্যবর্জিত উচ্চতায় সমাসীন, সেটাই বরং ঢের ভালো। 




এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন

close