শিরোনাম :

প্রচ্ছদ » ইসলাম

অলীকুল শিরোমণি শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (র.)

শুক্র, ০৬ মে'২০১৬, ২:১৫ অপরাহ্ন


অলীকুল শিরোমণি শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (র.)  
এ.কে.এম মহিউদ্দীন : মানুষের ফুরসত নেই! তাই বুঝি সে শুধু মৃত্যু আর জন্মদিনেই তার প্রিয় ব্যক্তিত্বকে মনে করে? সারাটা বছর ব্যক্তিটি থাকেন আড়ালে। সূর্যটা যেন ওইদিনই শুধু উঠল, চাঁদও মাত্র দুদিন উদিত হয়! এরকম শ্লেষ আমাকে জড়িয়ে ধরে অসংখ্য প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। বাস্তবত সৃজনশীল মানুষ তার চিন্তা-ধারা, বুদ্ধিবৃত্তি নিয়ে আমাদের ভাবনা রাজ্যে কড়া নাড়ে প্রতিদিন। তবু প্রচলের স্রোতধারায় শায়খ আব্দুল কাদের জিলানীকে (র.) মনে করতে হচ্ছে আজ। ১১ রবিউসসানী তার তিরোধান দিবস। এই অঞ্চলে এই দিনটি ফাতেহা-ই-ইয়াজ দাহম হিসেবে পরিচিত।
ব্যক্তিগতভাবে ভক্তি ও শ্রদ্ধা তখনই আমার ভেতরে জাগরিত হয়-যখন দেখি বুদ্ধিবৃত্তিতে তিনি বিশেষভাবে সমাদৃত। শায়খ আব্দুল কাদের জিলানীর পুরোনাম মহিউদ্দীন আব্দুল কাদের জিলানী। এই অঞ্চলে তাকে নিয়ে অনেক শ্রুতিময় বয়ান, স্তুতি রয়েছে। আছে নানা রকম লোককথা। আমরা সেসব নিয়ে এখানে আলোচনা করব না। আমরা তার কিছু চিন্তাধারা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের নজির নিয়েই প্রবন্ধটি সীমাবদ্ধ রাখব।
জগতের অনেকগুলি গ্রন্থের মধ্যে একটি বিখ্যাত গ্রন্থ ইমাম গাজালীর (র.) ইয়াহইয়াউল উলুমুদ্দিন। এটা এককথায় মানব জীবনের যাবতীয় বিষয় আশয় সন্নিবেশ করা বই। এ ধরনের বই সাধারণত বিশ্বকোষের মতই। এমন সিলসিলার শায়খ জিলানীর একটি অন্যতম গ্রন্থ গুনিয়াতুত তলেবীন। এই গ্রন্থ সম্পর্কে সাইয়েদ আলী নাদভীর মত হচ্ছে, যারা ইসলাহ ও নিজেকে সংশোধন করতে অভিলাষী তাদের জন্য বিশেষ করে সালিক ও মুরীদদের পথ প্রদর্শনের মূল্যবান দিকদর্শন রয়েছে এটিতে। গ্রন্থটির পুরোনাম : ‘আল গানিয়াতুত তালিবীনি তারিকুল হাক্কি আজঝা ওয়া জাল্লা’।
আলী নাদভী আরও যুক্ত করেছেন কিতাবটি সম্পর্কে। তিনি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলছেন, এই উম্মাতের সর্বাধিক জনপ্রিয় ধর্মীয় নেতা এবং রুহানিয়াতের ইমাম হজরত আব্দুল কাদের জিলানী তাঁর সঙ্গে জড়িত ও সংশ্লিষ্ট এবং ভবিষ্যতের আল্লাহ্‌র পথ অনুসন্ধানী সত্যনিষ্ঠ সত্তাদের জন্য লিখেছেন এটি। এটিতে ফরজ ও সুন্নাতসমূহ এবং এর আদব ও নীতিমালা, আল্লাহ্‌র মারিফাত ও অভিজ্ঞান লাভে সহায়ক বিশ্ব চরাচরে ছড়িয়ে থাকা প্রমাণাদি এবং খোদ মানুষের মধ্যে বিরাজিত নিদর্শনাদি কুরআন করিম ও হাদিস পাকের নির্যাস, সু-মহান পূর্বসুরী সালাফ ও বুজুর্গানের চরিত্র এবং সুমহান আদর্শ ও অবস্থার আকর্ষণীয় এবং শিক্ষাপ্রদ ঘটনাবলি এমনভাবে সংকলিত ও একত্রিত করা হযেছে যাতে এর আলোকে আল্লাহ্‌র পথে চলা সম্ভব হয়ে ওঠে, আল্লাহ্‌র সকল হুকুম মেনে চলা সহজ হয়ে যায় এবং হারাম ও নিষেধসমূহ থেকে ফিরে থাকা যায়। তাহারাত, সালাত, যাকাত, সিয়াম, হজ ইত্যাদি জরুরি আহকাম ও আদেশ-নিষেধসহ কুরআন, সুন্নাহ ও সীরাত পাকের আলোকে প্রমাণিত, একজন মুসলিমের জন্য প্রয়োজনীয় সকল আদব ও রীতিপদ্ধিতর বিবরণ এই গ্রন্থটিতে রয়েছে। যে ব্যক্তি ইসলামের বিধি-বিধান জানার জন্য কোনো সুবিজ্ঞ ফকীহ ও আলিম পান নি বা রুহানী বিষয়সমূহের জন্য কোনো অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ আধ্যাত্মিক শিক্ষক যার নসীবে ঘটেনি—তাদের সকলের জন্য এ গ্রন্থটি একজন পথপ্রদর্শক ও মুরশিদের কাজ দেবে।
এশিয়া ও আফ্রিকা—উভয় মহাদেশে এই গ্রন্থটির মাধ্যমে উপকৃত লোকদের সংখ্যা হাজার হাজার নয়, লাখ লাখ, কোটি কোটি।
শায়খ জিলানীর সময়কালটাতে দারুণ বিপর্যয় হয়েছিল মুসলমানদের। চরম অবক্ষয় ঘটেছিল মূল্যবোধের। তিনি ৭৩ বছর বাগদাদে কাটান। এই দীর্ঘক্ষণে আব্বাসী খিলাফতের পাঁচজন খলীফা পরপর খিলাফতের আসনে অধিষ্ঠিত হন।
মানুষেরা সময়টাকে অন্যভাবে নিল। তারা ঠিকমত আল্লাহ্‌র একত্ববাদ আমলে না নিয়ে গায়রুল্লাহ্‌র অসারতায় ঝুঁকে পড়ল। জনগণ সরকার ও সম্পদশালী লোকের আঁচলের সাথে সম্পর্কিত ছিল। লোকে বিভিন্ন প্রকার মানুষ ও ব্যক্তিকে মঙ্গল-অমঙ্গলের প্রভু মনে করত। সম্পদকে স্রষ্টার স্তরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। শায়খ জাতিকে সাবধান করলেন, আর লিখলেন—
সমস্ত সৃষ্টিজগতকে এভাবে ধরে নাও যে, তার মালিকের রাজত্ব খুবই বিস্তীর্ণ, আদেশ অতিশয় কড়া এবং পাকড়াও বড়ই ভয়াবহ। এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে গলা ও পায়ে শৃঙ্খল পরান হয়েছে। তারপর তাকে এক শক্ত বৃক্ষের শূলীতে চড়ান হয়েছে। তা এমন এক নদীর তীরে অবস্থিত যার তীর বিরাট বিস্তৃত ও প্রশস্ত। গভীরতা অতল এবং স্রোত অতিশয় প্রবল।
তিনি সুলতান মর্যাদাসম্পন্ন, সু-উচ্চ আসনবিশিষ্ট ও দুর্লভ সিংহাসনে উপবিষ্ট। তার আশপাশে রাশি রাশি তীর, খঞ্জর, বল্লম,ধনুক এবং বিভিন্ন প্রকারের অস্ত্র-শস্ত্র মওজুদ রয়েছে। তিনি ব্যতীত এর সংখ্যা কেউ নিরূপণ করতে পারেন না। অতঃপর তিনি শূলোপরি লোকটির প্রতি ইচ্ছামত ওই সব অস্ত্র-শস্ত্র নিক্ষেপ করতে লাগলেন।
যে এই দৃশ্য অবলোকন করেছে তার পক্ষে কি উচিত হবে যে সে সুলতানকে উপেক্ষা করে তার ভীতি অগ্রাহ্য করে এবং তার মুখাপেক্ষী হওয়ার প্রত্যাশা না করে, সে শূলোপরিস্থ লোকটিকে গ্রাহ্য করুক এবং তার মুখাপেক্ষী হোক? এরূপ কেউ করলে তাকে কি নির্বোধ, অজ্ঞ, পাগল,পশু ও অমানুষ বলা হবে না?
…অতএব তুমি দৃষ্টি লাভের পর অন্ধত্ব থেকে,মিলন লাভের পর বিচ্ছেদ থেকে, নৈকট্য ও সাহচর্য লাভের পর হটিয়ে দেওয়া থেকে, পথের সন্ধান লাভের পর পথভ্রষ্টতা থেকে এবং ঈমানদার হওয়ার পর কাফির হওয়া থেকে আল্লাহ তায়ালার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা কর।
(মাফাতিহুল গায়েব, মাকালা-১৭)
এভাবে মুসলিম উম্মাহকে বার-বার বিভিন্নভাবে তিনি সতর্ক করেছেন। ওয়াজ নসিহতসহ লিখনীর মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করেছেন।
শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (র.) মানুষের কাছে দাওয়াত পৌঁছাতে বুদ্ধিবৃত্তির সর্বোত্তম ব্যবহার করেছেন।
আরবি কবিতার একটি ফর্ম হচ্ছে কাসিদা। এ শব্দটির উৎপত্তি কাসাদা থেকে। যার আভিধানিক অর্থ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কাসিদার বৈশিষ্ট্য এই যে, কবিতা হতে হবে দীর্ঘ, কমপক্ষে পঞ্চাশ লাইন সম্বলিত এবং আগাগোড়া একই ছন্দ এবং অন্তমিল রক্ষা করতে হবে। কাসিদার তিনটি স্তর থাকে। প্রথমত, কবির দয়িতার বাসভূমির বর্ণনা থাকবে, স্মৃতি চারণের পরিপ্রেক্ষিতে দয়িতার জন্য আক্ষেপ। দ্বিতীয়ত, প্রেমিকা-কেন্দ্রিক দুঃখ-দুর্দশা, প্রেমিকার গোত্র-গোষ্ঠীর প্রশংসা ও অপ্রশংসা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রভৃতির বর্ণনা। তৃতীয়ত, ব্যর্থতার উচ্ছ্বাস এবং নীতিকথা।
কিন্তু এই ফর্ম ভেঙে নতুন এক ঘরানার কাসিদা লিখলেন শায়খ জিলানী (র.)। তার কাসিদাটি কাসিদায়ে গাউসিয়া হিসেব সমধিক পরিচিত। এই কাসিদা সম্পর্কে বলা হচ্ছে, এটি নানা কারণে অনন্য। ‘গাউসুল আযমের এই কাসিদা তাঁর স্বাভাবিক ও সাধারণ রচনা নয়। কেননা এই কাসিদা রচিত হয়েছে ওয়াজদের হালতে। হজরত বড়পীর সাহেবের শিখর স্পর্শ অধ্যাত্ম সাধনার কথা সুবিদিত। সাধনার এমন এক পর্যায় রয়েছে, যেখানে সাধক নিজেকে বিস্মৃত হন। মহাসত্তার মাঝে উপনীত হলে নিজের অস্তিত্ব থাকে না। থাকার কথাও না। এরকম ফানাফিল্লাহর স্তরে রচিত বলে কাসিদায়ে গাউসিয়া ব্যতিক্রমী এবং অহংযুক্ত হয়েছে। এই কাসিদা এতটাই বিখ্যাত ও এতটাই হৃদয়গ্রাহী যে, ওয়াজীফাহ হিসেবে পঠিত হয়ে থাকে’।
(দ্র.কাসিদা সওগাত : রুহুল আমীন খান)
এখন আমরা তার কাসিদায়ে গা্‌উসিয়া থেক উদ্ধৃতি দিচ্ছি-
কাসিদাটি শুরু হচ্ছে এভাবে :
‘প্রণয় করালো পান মিলনের সুরা পাত্রভরা
কহিলাম অয়িসুরে! এসো মোর কাছে, এসো ত্বরা।
এ আহ্বানে এলো ধেয়ে মদিরার পাত্রগুলো তেজে
বন্ধুদের পানে ঘুরে বসিলাম নেশার আমেজে।
মিশে যাও হালে মোর কহিলাম কুতুব সকলে
যোগ দাও মাহফিলে ভিড়ে যাও মোর ভক্তদলে।
তোমরা আমার সেনা পান করো দৃঢ় আস্থা রাখি
করিয়াছে পাত্র পূর্ণ দলপতি শ্রেষ্ঠতম সাকী।’-এভাবেই রচিত হয়ে শেষ হয়েছে ৩২ মিসরায়। কবিতার শেষের দিকে দার্ঢ্যস্বরে তিনি বলছেন,
মুজদা নিবাস মোর হাসানের আমি বংশধর
আমার কদম সব মনীষীর গ্রীবার উপর।
আব্দুল কাদির বলে সুবিখ্যাত নামটি আমার
দাদা মোর রাসূলুল্লাহ উৎস যিনি সব পূর্ণতার।
জেনে রেখো, প্রিয়পাত্র আহমাদ রিফাঈ আমার
অনুসারী অনুগামী সে যে মোর কর্ম, তরীকার।
(অনুবাদ: রুহুল আমীন খান)
এই মনীষী ও আমাদের প্রিয় শায়খ হিজরি ৬৬২ সালের ১১ রবিউসসানী ইহধাম ত্যাগ করেন। এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। তাঁর চার স্ত্রীর গর্ভে ২৭ পুত্র ও ২২ কন্যা জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (র.)কে তাজকিয়া ও ইহসানের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্করূপে বহুকাল মানুষ মনে রেখেছে। আরও বহুকাল সালেকদের হৃদয়ের মণিকোঠায় তিনি স্থিত থাকবেন একথা বলা যায়। তার কর্মোদ্দীপনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকা চিন্তাশীলদের জন্য অনবদ্য নিদর্শন। একথা বললে কোনো অত্যুক্তি হবে না সুনিশ্চিত তিনি অলীকুল শিরোমণি। আল্লাহ তার মর্যাদা আরও উচ্চকিত করুন। আমিন।
লেখক : গবেষক 




এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন

close